
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কখনোই কেবল দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়; এটি একই সঙ্গে ভূ-রাজনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি জটিল সমীকরণ।
ফলে ঢাকার রাজনৈতিক পরিবর্তন দিল্লির জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দিল্লির নীতিগত অবস্থানও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভ্রমণ ভিসা পুনরায় চালু হওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরে আসার প্রচেষ্টা এবং সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ বৃদ্ধি—এসবই ইঙ্গিত দেয় যে উভয় দেশ একটি বাস্তববাদী সম্পর্কের দিকে এগোতে আগ্রহী।
তবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে শুধুমাত্র বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। স্বাধীনতার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে সহযোগিতা যেমন ছিল, তেমনি অবিশ্বাস ও মতপার্থক্যও ছিল। সীমান্ত, নদীর পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য, সীমান্তে প্রাণহানি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গি—এসব বিষয় দীর্ঘদিন ধরেই সম্পর্ককে জটিল করে রেখেছে।
আওয়ামী লীগ আমলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক
২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর হয়। নিরাপত্তা সহযোগিতা, সন্ত্রাস দমন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বাণিজ্য, সড়ক-রেল-নৌ যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক সংযোগে দুই দেশ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করে।
ভারতের দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ ছিল একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা ও যোগাযোগ নিশ্চিত করতে ঢাকার সহযোগিতা দিল্লির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ পর্যায়ে পৌঁছে।
তবে এই সময়েও তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্তে বাংলাদেশি নিহত হওয়া, বাণিজ্য বৈষম্য এবং অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে সমালোচনা ছিল। অনেকের মতে, সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও সব অমীমাংসিত সমস্যা সমাধান হয়নি।
বিএনপি ও ভারতের সম্পর্ক: অতীতের সংশয়
ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি ও ভারতের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে সতর্ক ও সংবেদনশীল ছিল। বিশেষ করে ২০০১–২০০৬ সালে সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং কিছু নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়।
ভারতের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশের মধ্যে দীর্ঘদিন বিএনপিকে নিয়ে কিছুটা সংশয় ছিল। ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলাসহ কয়েকটি আলোচিত ঘটনা সেই অবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়েছিল। একই সময়ে বিএনপি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, তিস্তা চুক্তি এবং সীমান্ত ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথাও বলে এসেছে।
ইউনূস আমলে নতুন বাস্তবতা
ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও শুরুতে কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। সীমান্ত পরিস্থিতি, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং আঞ্চলিক কৌশলগত প্রশ্নে পারস্পরিক সতর্কতা লক্ষ্য করা যায়।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা বাড়তে থাকে থাকলেও বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভ্রমণ ভিসা পুনরায় চালু না হওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্য সচল করার উদ্যোগ থাকলেও সরকারি পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ না থাকয় সম্পর্ক খুব বেশি স্বাভাবিক পর্যায় পৌছায়নি।
বাস্তববাদী অবস্থানে ভারত ও বিএনপি
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি আদর্শ নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ। সেই বাস্তবতা এখন ভারত ও বিএনপি—উভয় পক্ষের অবস্থানেই ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
ভারত বুঝতে পারছে যে বাংলাদেশের যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তার সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা কৌশলগতভাবে অপরিহার্য। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ, বঙ্গোপসাগরভিত্তিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সংযোগের কারণে দিল্লির জন্য ঢাকার সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক অপরিহার্য।
অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর সাম্প্রতিক বক্তব্য ও কূটনৈতিক অবস্থানে তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যায়। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বহুমুখী বৈদেশিক নীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা আগের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান।
তারেক এর চীন সফর, ভারত ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি
সাম্প্রতিক সময়ে তারেক রহমানের বিদেশ সফর এবং বিশেষ করে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে নানা বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে। তবে সংবাদমাধ্যমের আলোচনা সবসময় ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক নীতির প্রতিফলন নয়।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি—ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে একই সঙ্গে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং অন্যান্য অংশীদার দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা সম্প্রসারণ।
ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করতে বাধ্য। একইভাবে, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম অমীমাংসিত ইস্যু। জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে খালেদা জিয়া এবং বর্তমানে তারেক রহমান—বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্ব তিস্তা ইস্যুকে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ভারতীয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান, এই সমস্যার সমাধানকে দীর্ঘদিন ধরে জটিল করে রেখেছে।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
ভারত-বিএনপি সম্পর্কের সামনে এখনও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়ে গেছে—তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্তে প্রাণহানি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য বৈষম্য কমানো, আঞ্চলিক সংযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, নিরাপত্তা সহযোগিতায় পারস্পরিক আস্থা বজায় রাখা। এসব বিষয়ে অগ্রগতি হলে দুই পক্ষের সম্পর্ক আরও স্থিতিশীল হতে পারে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে এখন আর শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ বা বিএনপিকেন্দ্রিকভাবে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। বর্তমান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় উভয় দেশের কাছেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারস্পরিক জাতীয় স্বার্থ।
ভারতের জন্য বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদার, আর বাংলাদেশের জন্য ভারত একটি বড় প্রতিবেশী, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্র। ফলে ভবিষ্যতের সম্পর্ক নির্ধারিত হবে রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে বাস্তববাদ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে।
Author