
সাম্প্রতিক বেইজিং সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। এই বৈঠক নিয়ে বিবিসির প্রতিবেদনটি পলিসি পেপারের পাঠকদের জন্য অনুবাদ করে দেয়া হলো।
অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনা এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশে সরকার চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে সরকার প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কেও একটি নতুন ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণের চেষ্টা করছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম রাষ্ট্রিয় সফরে তারেক রহমান মালয়েশিয়া হয়ে চীনে যান। তাই এই সফরকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকার সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সফরের গন্তব্য নির্বাচন ঢাকার কৌশলগত অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের প্রচেষ্টার প্রতিফলন। ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার নবনির্বাচিত নেতাদের প্রথম সরকারি সফরের প্রধান গন্তব্য থাকে ভারত। ফলে তারেক রহমানের চীন সফরকে ভারতের উদ্দেশে একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন অনেক ভারতীয় পর্যবেক্ষক। বিশেষ করে, ভারত দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল।
দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার মধ্যে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের সহযোগিতা চাওয়া এবং মোংলা বন্দরের কাছে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) গড়ে তোলার চুক্তি বিশেষভাবে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
বাংলাদেশের উপর প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তি—চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে এসব উদ্যোগ দিল্লিতে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। বর্তমানের তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন।
পরবর্তীতে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন অব্যাহত থাকে। এ সময় ভারত উচ্চপর্যায়ের সফর থেকে বিরত ছিল।
তবে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর বিজয়ের পর তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর উভয় দেশই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ বলেন, “দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা যে তুলনামূলকভাবে কমেছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
তিনি আরও বলেন, সীমান্তবর্তী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে এবং ভারত আবারও বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পর্যটক ভিসা ইস্যু শুরু করেছে।
প্রায় ১৮ মাস বন্ধ থাকার পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যাত্রীবাহী বাস চলাচল আংশিকভাবে পুনরায় চালু হয়েছে। বর্তমানে কলকাতা-ঢাকা এবং ঢাকা-আগরতলা রুটে বাস চলাচল করছে।
চলতি বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে সংকট দেখা দিলে ভারত সীমান্তবর্তী মৈত্রী পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে জরুরি ভিত্তিতে কয়েক হাজার টন জ্বালানি তেল সরবরাহ করে।
গত মাসে ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাৎপর্যপূর্ণ এক পদক্ষেপ হিসেবে ভারত সরকার তাঁকে মন্ত্রিসভার (ক্যাবিনেট) মর্যাদা প্রদান করেছে, যা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে দিল্লির আগ্রহের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং উভয় দেশের পাল্টাপাল্টি বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গত বছর বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ‘২ লাখ ১৪ হাজার ৪২৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যার বড় অংশই ভারতের অনুকূলে ছিল।
তবে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এখনো বেশ কিছু অমীমাংসিত ইস্যু ও মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
বিশেষ করে শেখ হাসিনার প্রতি ভারতের সমর্থনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী জনমত জোরালো হয়েছে। একই সঙ্গে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) যাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করছে, তাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর অভিযোগও ঢাকায় ব্যাপক বিতর্ক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত যথাযথ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই প্রধানত বাংলাভাষী মুসলিমসহ হাজার হাজার মানুষকে বাংলাদেশে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত যথাযথ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই প্রধানত বাংলাভাষী মুসলিমসহ হাজার হাজার মানুষকে বাংলাদেশে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশি বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নির্বাচনের সময় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকদের বাংলাদেশ বিরোধী বলে অভিযোগ ওঠা উসকানিমূলক মন্তব্যও ঢাকার প্রতি দিল্লির বার্তা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, “এসব বিষয় বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে এবং জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাব কোনো না কোনোভাবে ঢাকার নীতিনির্ধারণী চিন্তাভাবনাতেও পড়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "বাংলাদেশ সরকার এসব বিষয়কে কিংবা ইতিবাচক ইঙ্গিতগুলোকে উপেক্ষা করেনি।"
মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আঞ্চলিক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে তৃণমূলের প্রায় ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যে ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও জাতিগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততাকে ভারত অত্যন্ত সংবেদনশীল নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে দুই দেশের আলোচনা বহু বছর ধরে অমীমাংসিত রয়েছে। বেইজিং সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ জানায়, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে যৌথ কারিগরি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা নদীর নাব্যতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে ড্রেজিং, পলি অপসারণ এবং কৃষিকাজের উপযোগী করে নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ বলেন, "আমাদের সীমান্তের এত কাছাকাছি কোনো প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা সব সময়ই উদ্বেগের বিষয় হবে। তাই এমন উদ্যোগকে আমরা অবশ্যই স্বাগত জানাব না।"
ভারত ও চীনের মধ্যে কয়েক দশক ধরে সীমান্ত বিরোধ চলছে। ১৯৬২ সালের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ ভারতের জন্য অপমানজনক পরাজয়ে শেষ হয়েছিল। পরবর্তী সময়েও সীমান্তে সংঘর্ষে উভয় পক্ষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ হলে দেশটি ভারতের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের আরও কাছাকাছি অবস্থান নিতে পারবে। প্রায় ২২ কিলোমিটার (১৪ মাইল) দীর্ঘ এই করিডর, যা ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত, ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের একমাত্র স্থলসংযোগ।
বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বক্তব্য, আগের সরকারগুলোও তিস্তা প্রকল্পে ভারতকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিল, কিন্তু দিল্লি সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘ সময় নিয়েছিল। তাদের মতে, এ ধরনের বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও আর্থিক সক্ষমতা চীনের রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরের সময় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন সাংবাদিকদের বলেন, "আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটি তৃতীয় পক্ষের প্রভাবমুক্ত থাকা উচিত।"
চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ। বাংলাদেশের মোট অস্ত্র আমদানির ৭০ শতাংশেরও বেশি আসে চীন থেকে। এছাড়া বাংলাদেশের কাছে চীনের পাওনা ঋণের পরিমাণ ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের (প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন পাউন্ড) বেশি।
এই সফরের সময় চীন চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর (China–Myanmar–Bangladesh Economic Corridor) গড়ে তোলারও প্রস্তাব দেয়, যা চীনের ইউনান প্রদেশকে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত করবে।
দীর্ঘদিন ধরে ভারত দক্ষিণ এশিয়াকে নিজের প্রভাববলয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। তবে গত কয়েক বছরে চীন বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে ধারাবাহিকভাবে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতি বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ভারতের জন্য একটি জটিল বিষয় হলো ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার (প্রত্যর্পণ) অনুরোধ ইতোমধ্যে ঢাকা জানিয়েছে।
গত বছর ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনে দমন-পীড়নের ঘটনায় শত শত মানুষের মৃত্যুর অভিযোগে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিত অবস্থায় মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। শেখ হাসিনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
শ্যাম শরণের ভাষায়, "যতদিন শেখ হাসিনা দিল্লিতে অবস্থান করবেন, ততদিন তারেক রহমানের জন্য রাজনৈতিকভাবে ভারত সফর কিছুটা কঠিন হতে পারে।"
তবে কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, তা সত্ত্বেও তারেক রহমান ভবিষ্যতে দিল্লি সফর করতে পারেন। কারণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত—উভয় দিক থেকেই ভারত বাংলাদেশের জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী যে তাকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে ভারতও জানে, বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওই অঞ্চলে এখনো বিভিন্ন জাতিগত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে আঞ্চলিক দুই প্রধান শক্তি—ভারত ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
Author