
গত এক দশকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের চোখে ‘চীন’ শব্দটির সঙ্গে যে ছবিগুলো সবচেয়ে বেশি ভেসে উঠেছে, সেগুলো হলো—পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা-কক্সবাজার রেলপথ কিংবা যমুনার ওপর বঙ্গবন্ধু রেল সেতু। অর্থাৎ, আমাদের অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভাবনায় চীন মানেই ছিল বড় বড় দৃশ্যমান অবকাঠামো, ভারী নির্মাণযন্ত্র আর মেগা প্রজেক্টের ঋণসহায়তা। কিন্তু ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের বেইজিং সফর বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক বড় ধরনের মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রীর এই প্রথম দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় সফরটি শুধু পুরোনো সম্পর্কের নবায়ন নয়, বরং এটি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার অংশীদারত্বকে ইট-পাথরের দেয়াল পেরিয়ে উচ্চপ্রযুক্তির মহাসড়কে নিয়ে যাওয়ার এক দূরদর্শী প্রয়াস।
এই সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ ২০২৯ সালে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) উত্তরণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে, আবার মাত্রই নতুন একটি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এলডিসি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর সস্তা শ্রমের ওপর ভর করে বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকা আর সম্ভব হবে না। বাংলাদেশকে এখন উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, রপ্তানি বহুমুখী করতে হবে এবং সবচেয়ে বড় কথা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তিকে আপন করে নিতে হবে। এবারের সফরে আলোচনার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি এবং স্মার্ট উৎপাদন অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আর ঠিক এই জায়গাতেই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের একটি গুণগত রূপান্তর বা 'প্যারাডাইম'-এর সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশের সামর্থ্য না থাকলেও এই রূপান্তরে যথেষ্ট আগ্রহ দেখাচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সদ্য ঘোষিত জাতীয় বাজেটে ইলেকট্রিক যানবাহন (EV), সৌরশক্তি, লিথিয়াম ব্যাটারি এবং উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প কাঁচামাল আমদানিতে ব্যাপক কর ও শুল্কসুবিধা দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম সৌর প্যানেল ও ইভি উৎপাদনকারী দেশ চীনের জন্য এটি একটি বড় সবুজ সংকেত হতে পারে।
বেইজিংয়ে ২৫ জুনের ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলন’ এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রায় ৪,১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া ৮০০ একরের ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল’ (CEIZ) কেবল সাধারণ কোনো শিল্পাঞ্চল নয়, এটি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম হাই-টেক উৎপাদন কেন্দ্র। বিশ্বজুড়ে সরবরাহশৃঙ্খলের যে পুনর্বিন্যাস হচ্ছে, তার সুবিধা নিয়ে চীন এখন তাদের উচ্চপ্রযুক্তির কারখানাগুলো নিজ দেশের বাইরে স্থানান্তরের সুযোগ খুঁজছে। কর্ণফুলী টানেল ও চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় এই অঞ্চলের ভৌগোলিক সুবিধা ভবিষ্যতের রোবোটিক্স, মোবাইল ও মেডিকেল ইকুইপমেন্ট এবং ইভি ব্যাটারি তৈরির কারখানাকে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার পথ সুগম করতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে তাকালে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের এই নতুন মোড়টি এক ভিন্ন হিসাব-নিকাশ তৈরি করে। এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলো চীনের কাছ থেকে মূলত ঋণ এবং বড় বড় দৃশ্যমান অবকাঠামোই বেশি গ্রহণ করেছে। কিন্তু পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা আমাদের দেখায় যে, শুধু ইট-পাথরের মেগা প্রজেক্ট দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মুক্তি বা প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা দিতে পারে না। অন্যদিকে, ভূরাজনৈতিক ও সীমান্ত উত্তেজনার কারণে চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য ভারতের বাজারে আগের তুলনায় কার্যক্রম পরিচালনা করা অনেক কঠিন হয়ে উঠেছে, যদিও ভারত নিজস্ব ইভি এবং শক্তিশালী ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরি করছে।
ঠিক এই জায়গাতেই বাংলাদেশ একটি অনন্য এবং বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করতে পারে। কোনো ধরনের ভূরাজনৈতিক জটিলতায় না জড়িয়ে, বাংলাদেশের উচিত চীনের 'ডিজিটাল সিল্ক রোড' (Digital Silk Road) নীতিকে নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থে আত্মীকরণ করা। চীন যখন তার উচ্চপ্রযুক্তির কারখানাগুলো স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তখন দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বিকল্প এবং পাকিস্তানের চেয়ে নিরাপদ ও স্থিতিশীল গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশ প্রথম সারির সম্ভাব্য গন্তব্যগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ শুধু পণ্য আমদানিকারক দেশ হিসেবে নয়, বরং এই অঞ্চলের অন্যতম বড় 'হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিং হাব' বা প্রযুক্তি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সুবর্ণ সুযোগ পেতে পারে। এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতাবানরা এর কতটুকু বাস্তবায়ন হতে দেয়।
বিনিয়োগের এই সম্ভাবনার পেছনে বড় শক্তি হতে পারে চীনের নিজস্ব প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব। চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এআই (AI) গবেষণা ও পেটেন্টধারী দেশ। DeepSeek, Alibaba Cloud, Huawei Cloud-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং ও স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে বৈশ্বিক মানদণ্ড নির্ধারণ করছে। বাংলাদেশ যদি এবারের ২৩ খাতভিত্তিক সহযোগিতা পরিকল্পনার আওতায় এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা, জাতীয় ডেটা সেন্টার ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর (Technology Transfer) কর্মসূচি গড়ে তুলতে পারে, তবে দেশের ডিজিটাল রূপান্তর ও উৎপাদনশীলতা আরও ত্বরান্বিত হওয়া সম্ভব।
তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার সমান্তরালে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ ও সতর্কতার জায়গাও আমাদের সামনে রয়েছে। চীন প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হলেও, সেই প্রযুক্তিকে ধারণ করার মতো দক্ষ ডেটা সায়েন্টিস্ট, এআই ইঞ্জিনিয়ার বা কারিগরি জনবল আমাদের দেশে এখনো সীমিত। চীনের দেওয়া শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধার পরও আমাদের সাড়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারের যে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি, তা দূর করতে হলে শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ গবেষণা এবং একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি কোলাবোরেশন এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার অপরিহার্য। দুর্নীতির লাগাম টেনে না ধরা গেলে সব স্বপ্নই দিন শেষে দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে।
একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে অভূতপূর্ব উত্থান চলছে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশ তা কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারবে না। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই সুফল পেতে আমাদের এই প্রযুক্তির বিস্ফোরণকে আলিঙ্গন করতেই হবে, তবে তা করতে হবে অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে। কারণ, এই রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের সামনে চলে আসছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (Privacy) সুরক্ষা এবং বড় ধরনের নৈতিক সংকটের (Ethical Dilemma) মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো। ক্লাউড কম্পিউটিং ও এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে নাগরিকদের তথ্যের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এর অপব্যবহার রোধ করা আমাদের প্রধান নৈতিক দায়িত্ব (Ethical Responsibility)। তাছাড়া তীব্র অটোমেশনের কারণে শ্রমবাজারের একটি বড় অংশের চাকরি হারানোর (Job Displacement) যে বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে, তা মোকাবিলায় আমাদের শ্রমিকদের নতুন করে দক্ষ বা ‘আপ-স্কিল’ (Up-skill) করতে হবে। সংক্ষেপে, এআই-এর এই জয়জয়কারকে স্বাগত জানিয়েই এর সম্ভাব্য সামাজিক ও আইনি ঝুঁকিগুলো দূর করতে একটি শক্ত আইনগত কাঠামো ও দূরদর্শী নীতিমালা প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।
বাস্তবতা হলো, একুশ শতকের বৈশ্বিক অর্থনীতি আর কেবল ভৌগোলিক আয়তন বা সামরিক শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হবে না; এটি নিয়ন্ত্রিত হবে ডেটা, অ্যালগরিদম এবং পরিবেশবান্ধব সবুজ প্রযুক্তি দিয়ে। চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের এই নতুন অধ্যায় যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার একটি উদীয়মান অর্থনীতিই থাকবে না, বরং এই অঞ্চলের প্রযুক্তির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে। ইট-পাথরের সেতু আমরা তৈরি করেছি, এবার সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর প্রযুক্তির ডানায় ভর করে 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার ডিজিটাল সেতুটি নির্মাণ করার। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা আবশ্যক। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর সেই ঐতিহাসিক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। শেষ পর্যন্ত ঘুরেফিরে সেই একই প্রশ্ন; বাংলাদেশ কি পারবে? নাকি সরকারে থাকা কিছু মানুষের ব্যক্তিগত খায়েশের কাছে সব ভালো উদ্যোগ আরেকটি বার ভেস্তে যাবে!
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও শিক্ষক
Author