
পশ্চিম তীরে ইহুদি উগ্রবাদী সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াইকে আরও জোরদার করতে হবে। ইসরায়েলি সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা, উৎসাহ ও সহযোগিতায় যে সহিংস কর্মকাণ্ড প্রতিনিয়ত ঘটছে, তা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
পশ্চিম তীরে বর্তমানে যা ঘটছে, সেটিকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা কিছু উগ্র ব্যক্তির কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একসময় এসব ঘটনাকে কিছু ‘বখে যাওয়া তরুণের’ কাজ বলে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। একইভাবে, সেটলার আন্দোলনের নেতারা প্রায়ই দাবি করেন যে এসব অপরাধ একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কাজ। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ সে দাবিকে সমর্থন করে না।
আজ স্পষ্ট করে বলতে হবে, ইসরায়েলের ক্ষমতাসীন মহল পরিকল্পিত ও ধারাবাহিকভাবে এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। আর এসব ঘটনা ঘটছে না গাজায়, দক্ষিণ লেবাননে বা সিরিয়ায়; বরং পশ্চিম তীরের সেইসব এলাকায়, যেগুলোর নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব সরাসরি ইসরায়েলি রাষ্ট্র ও তার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর হাতে।
এই নীতির প্রধান দায় বর্তায় প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের ওপর। পাশাপাশি সরকারের আরও অনেক মন্ত্রীর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড থেকেও তাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তারা পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে একীভূত করতে চান, কিন্তু সেখানে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের ছাড়া। বিশেষ করে ইতামার বেন-গাভির, বেজালেল স্মটরিচসহ কয়েকজন মন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের পশ্চিম তীর থেকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
আমার এই কথাগুলো অনেকের কাছে কঠোর মনে হতে পারে। ইসরায়েলি সরকার ও নিরাপত্তা কাঠামোর বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ খুব কমই শোনা গেছে, বিশেষ করে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বা সাবেক দায়িত্বশীল নেতার কাছ থেকে। কিন্তু দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর এখন আর সত্য গোপন রাখার সুযোগ নেই।
পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে প্রতিদিন যা ঘটছে, তার বিষয়ে নীরব থাকার কোনো নৈতিক বা মানবিক ভিত্তি নেই। মানুষ নিজ ঘরে ও ঘরের বাইরে হামলার শিকার হচ্ছে। ঘরবাড়ি ও কৃষিজমিতে আগুন দেওয়া হচ্ছে। গবাদিপশু ও অন্যান্য সম্পদ লুট করে নেওয়া হচ্ছে, যা অনেক পরিবারের প্রধান জীবিকার উৎস। এসব ঘটনার পরও যদি আমরা নীরব থাকি, অপরাধীদের এড়িয়ে যাই কিংবা তাদের জবাবদিহির আওতায় না আনি, তাহলে তা হবে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করার শামিল।
গত দুই বছরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ফোরামেই গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোর অনেকেও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে আমি সবসময়ই বলে এসেছি, গাজায় ইসরায়েল কোনো গণহত্যা চালায়নি এবং রাষ্ট্র হিসেবে তাদের এমন কোনো উদ্দেশ্যও ছিল না।
এটা অবশ্যই সত্য যে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েল যেভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করেছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই অত্যন্ত কঠোর ও নির্মম ছিল। কিছু ঘটনায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাস্তবতা হলো, এমন ঘটনা ঘটেছে—আমরা তা স্বীকার করি বা না করি। তবে আমার বিশ্বাস, সরকার কখনোই গণহত্যাকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করেনি এবং এমন কোনো পরিকল্পিত বা পদ্ধতিগত কর্মকাণ্ডও পরিচালনা করেনি, যা আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার সংজ্ঞার আওতায় পড়ে।
আমি এর আগেও স্বীকার করেছি যে, গাজায় কিছু ক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এ বিষয়ে আমি প্রকাশ্যেও কথা বলেছি। বিদেশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বহুবার চেষ্টা করেছে, যেন আমি ইসরায়েলি সরকারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তুলি অথবা বলি যে, সরকারের জ্ঞাতসারে ও অনুমোদনে গাজায় নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে। কিন্তু আমি এমন দাবি করিনি, কারণ আমি তা সত্য বলে মনে করি না।
আমি জানি, গাজায় দায়িত্ব পালন করা অনেক সৈন্য, পাইলট ও সামরিক কর্মকর্তা যুদ্ধের সময় নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত এবং নিরীহ মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় মানসিকভাবে ভুগছেন। তাদের অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়ে অনুশোচনার কথা জানিয়েছেন।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, অভিযানের লক্ষ্য নির্ধারণ বা সামরিক কৌশল প্রণয়নের দায়িত্ব মাঠপর্যায়ের সৈন্যদের ছিল না। তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছেন। নিঃসন্দেহে কিছু নির্দেশনা ছিল অপর্যাপ্ত বিবেচনাপ্রসূত এবং অনেক ক্ষেত্রে বেসামরিক মানুষের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও, গণহারে মানুষ হত্যার উদ্দেশ্যে সচেতনভাবে কোনো অভিযান পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল—এমন প্রমাণ আমি দেখিনি। সরকার কিংবা মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যও প্রকাশ্যে বা গোপনে এমন নীতি গ্রহণ করেছেন বলে আমার বিশ্বাস নয়।
এ কারণেই আমি মনে করি, গাজায় সংঘটিত অপরাধগুলোকে অস্বীকার করা না গেলেও এগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিকল্পিত গণহত্যা হিসেবে আখ্যা দেওয়া সঠিক হবে না। একই কারণে প্রধানমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী বা শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির যৌক্তিকতা নিয়েও আমার প্রশ্ন রয়েছে। অতীতে যেমন এই অবস্থান নিয়েছি, আজও আমি সেই অবস্থানেই আছি।
তবে পশ্চিম তীরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে গত কয়েক মাসে যা ঘটছে, তার ক্ষেত্রে একই ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না।
আমার কাছে কোনো সন্দেহ নেই যে, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন—এমন হাজারো ফিলিস্তিনির বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ, নিপীড়ন ও জোরপূর্বক উচ্ছেদের দায় সরাসরি ইসরায়েলি সরকারের ওপর বর্তায়।
যেসব ইসরায়েলি সেটলার এসব হামলা, দখল ও সহিংসতায় জড়িত, তারা রাষ্ট্রীয় সহায়তা, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থায়ন ছাড়া এত দূর যেতে পারত না। স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা ছাড়া এই মাত্রার সহিংসতা দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
পশ্চিম তীরে চলমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলি পুলিশের ভূমিকাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। তাদের দায়িত্ব ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং সহিংসতা প্রতিরোধ করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তারা অনেক ক্ষেত্রেই নিষ্ক্রিয় থেকেছে। এমনকি কিছু ঘটনায় হামলাকারীদের সহায়তা করার অভিযোগও উঠেছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বহু ক্ষেত্রে হামলাকারীদের পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত ফিলিস্তিনিদেরই আটক করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে হামলার ঘটনায় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) নিয়মিত ও রিজার্ভ সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও বারবার সামনে এসেছে। যদিও আইডিএফের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এসব ঘটনা বাহিনীর নীতির অংশ নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিভিন্ন এলাকায় সেনাসদস্যদের সরাসরি হামলা ও সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য ও অভিযোগ ক্রমাগত প্রকাশ পাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব হামলা প্রাণঘাতীও হয়েছে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেটের ভূমিকাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দীর্ঘ সময় ধরে এই সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি, তাদের দক্ষতা, সক্ষমতা ও পেশাদারিত্ব কতটা উচ্চমানের। সে কারণেই পশ্চিম তীরে ক্রমবর্ধমান ইহুদি উগ্রবাদী সহিংসতা মোকাবিলায় শিন বেট কেন আরও কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না, তার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আমি দেখি না। সন্ত্রাস প্রতিরোধই তাদের দায়িত্ব—সেটি ফিলিস্তিনি উগ্রবাদ হোক কিংবা ইহুদি উগ্রবাদ।
অবশ্য এই ব্যর্থতা বর্তমান শিন বেট প্রধানের আমলে শুরু হয়নি। এটি বহু বছরের সমস্যা। তবে দীর্ঘদিনের ব্যর্থতাকে অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়ারও কোনো কারণ নেই।
পশ্চিম তীরে চলমান সহিংসতা বন্ধ করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা ইসরায়েলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর দায়িত্ব। কিন্তু যদি সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, যদি পুলিশ অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয় এবং যদি নিরাপত্তা বাহিনী চোখ বন্ধ করে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একসময় হস্তক্ষেপ করতেই পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, সংগঠন কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। একইভাবে, হেগভিত্তিক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতও (আইসিসি) ভবিষ্যতে আরও কঠোর ও নির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। কারণ এসব ঘটনায় জড়িত অনেক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর পরিচয় ইতোমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে।
দুঃখজনকভাবে, ইসরায়েলি নীতির সমালোচনা উঠলেই অনেকেই সেটিকে ইহুদিবিদ্বেষ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন। নিঃসন্দেহে বিশ্বে ইহুদিবিদ্বেষ রয়েছে এবং তা উদ্বেগজনক। কিন্তু ইসরায়েল সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনাকে ইহুদিবিদ্বেষের সঙ্গে এক করে দেখলে বাস্তব সমস্যাগুলো আড়াল হয়ে যায়।
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতা, ঘরবাড়ি ধ্বংস, জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং নিপীড়নের ঘটনাগুলোকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশ্ব আজ এসব ঘটনা দেখছে এবং বিচারও করছে।
এখন সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। সময় এসেছে ভণ্ডামি ও আত্মপ্রবঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে নিজেদের সমাজের ভেতরে বেড়ে ওঠা উগ্রবাদ ও সহিংসতার মুখোমুখি হওয়ার।
(ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ-এ প্রকাশিত লেখাটি অনুবাদ করা হয়েছে)

Author