
রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি শব্দ, একটি উপমা কিংবা একটি অবমাননাকর মন্তব্য রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে দেয়। শাসকের কাছে তা হয়তো একটি সাধারণ রাজনৈতিক মন্তব্য, কিন্তু জনতার কাছে সেটি হয়ে ওঠে অপমান, প্রতিরোধ এবং আত্মপরিচয়ের নতুন ভাষা।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে “রাজাকারের নাতি-পুতি” মন্তব্য যেমন ছাত্র আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল, তেমনি ভারতে ২০২৬ সালে “তেলাপোকা” বা “ককরোচ” শব্দকে কেন্দ্র করে জন্ম নিয়েছে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। দুই দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও ঘটনাদ্বয়ের মধ্যে এমন কিছু মিল রয়েছে, যা উপেক্ষা করা কঠিন।
প্রশ্ন হচ্ছে—রাজাকারের নাতি থেকে তেলাপোকা, ঢাকা থেকে দিল্লির দূরত্ব আসলে কত?
একটি শব্দের রাজনৈতিক বিস্ফোরণঃ
২০২৪ সালের ১৪ জুলাই বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলেছিলেন—“মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা চাকরি পাবে না তো কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা চাকরি পাবে?”
এই বক্তব্য মুহূর্তেই রাজনৈতিক বিস্ফোরণে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীরা এটিকে শুধু একটি মন্তব্য হিসেবে নেয়নি; বরং নিজেদের ন্যায়সঙ্গত দাবিকে অপমান এবং রাজনৈতিকভাবে হেয় করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছিল। ফলাফল ছিল নজিরবিহীন। “আমি কে, তুমি কে—রাজাকার, রাজাকার” স্লোগান দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলন দ্রুত গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়।
ভারতেও এক ধরনের প্রতীকী পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে।
এক মামলার শুনানিতে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত কিছু ব্যক্তিকে “ককরোচ” বা “তেলাপোকা” বলে উল্লেখ করেছিলেন। পরে তিনি ব্যাখ্যা দিলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক তরুণ এই মন্তব্যকে প্রতিষ্ঠানের ঔদ্ধত্য ও তরুণ প্রজন্মের প্রতি অবজ্ঞার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে।
পরদিনই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ভারতীয় শিক্ষার্থী অভিজিৎ দিপকে “ককরোচ জনতা পার্টি” (সিজেপি) প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে এটি ছিল ব্যঙ্গাত্মক একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেটি কোটি কোটি অনুসারীর আন্দোলনে পরিণত হয়।
অপমান থেকে প্রতিরোধের জন্ম
রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি নতুন কিছু নয়।বহু সময় শাসকগোষ্ঠী যে শব্দ দিয়ে বিরোধীদের অপমান করতে চেয়েছে, সেই শব্দই পরে প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে “রাজাকার” শব্দটিকে শিক্ষার্থীরা ব্যঙ্গাত্মকভাবে নিজেদের স্লোগানে রূপান্তর করেছিল।
ভারতে “তেলাপোকা” এখন একই রকম রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হওয়ার পথে।
সিজেপির ভাষ্য অনুযায়ী, তেলাপোকা এমন একটি প্রাণী, যা চরম প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। অন্ধকারে, অবহেলায়, আঘাতের মধ্যেও তার বেঁচে থাকার ক্ষমতা আছে। তাদের মতে, ভারতের তরুণ প্রজন্মও আজ অনেকটা সেই অবস্থায় রয়েছে—অবহেলিত, হতাশ, কিন্তু এখনও পরাজিত নয়।
সোশ্যাল মিডিয়ার নতুন রাজনীতিঃ
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলন এবং ভারতের সিজেপির উত্থানের আরেকটি বড় মিল হলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের শক্তি।
একসময় রাজনৈতিক দলগুলো সংগঠন, কর্মী ও মাঠভিত্তিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করত। এখন একটি ইনস্টাগ্রাম পেজ, একটি ভাইরাল ভিডিও কিংবা একটি প্রতীকও লাখো মানুষের আবেগকে সংগঠিত করতে পারে।
বাংলাদেশে কোটা আন্দোলনের সময় ফেসবুক, টিকটক এবং মেসেঞ্জার ছিল আন্দোলনের প্রধান যোগাযোগমাধ্যম।
ভারতে সিজেপির বিস্তার ঘটেছে মূলত ইনস্টাগ্রাম, এক্স এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে। প্রচলিত রাজনৈতিক দলের বাইরে থেকেও তারা জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
আন্দোলন যখন মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করে
সিজেপিকে প্রথম দিকে অনেকেই একটি অনলাইন মিম-ভিত্তিক উদ্যোগ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, বিষয়টি আর কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
নয়াদিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে অনুষ্ঠিত বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে সিজেপির আন্দোলন সরাসরি আলোচনায় আসে।
ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতা জি দেবরাজন এবং জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ যুক্তি দেন, ভারতের নতুন প্রজন্ম বেকারত্ব, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস, সিবিএসই মূল্যায়নসংক্রান্ত অনিয়ম এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা নিয়ে ক্ষুব্ধ। এই ক্ষোভকে উপেক্ষা করা রাজনৈতিক ভুল হবে।
তাঁদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই ‘ইন্ডিয়া’ জোট আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে।
এই ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ভারতের বৃহত্তম বিরোধী জোট এমন একটি আন্দোলনের দাবিকে গ্রহণ করল, যার জন্ম হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং যার প্রতীক ছিল “তেলাপোকা”।
কেন বিরোধীরা গুরুত্ব দিচ্ছে?
তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি, শিবসেনা (ইউবিটি), সিপিআই, সিপিআই (এমএল)—প্রায় সব প্রধান বিরোধী দল কোনো না কোনোভাবে সিজেপির আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
শিবসেনা প্রধান উদ্ধব ঠাকরের মন্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ—“তেলাপোকাদের কখনোই অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়।”
এই বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক রসিকতা নয়; বরং ইতিহাস থেকে নেওয়া একটি সতর্কবার্তা।
কারণ ইতিহাস বলছে, তরুণদের ক্ষোভকে যখন ক্ষমতাসীনরা অবজ্ঞা করে, তখন সেই ক্ষোভ অনেক সময় অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্ম দেয়।
বিজেপির উদ্বেগ এবং বিরোধীদের হিসাবঃ
বিজেপির একটি অংশ মনে করছে, সিজেপির পেছনে বিদেশি প্রভাব কিংবা রাজনৈতিক মদদ রয়েছে। কেউ জর্জ সোরসের নাম তুলছে, কেউ আম আদমি পার্টির সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার কথা বলছে।
অন্যদিকে বিরোধীরা আন্দোলনের সাংগঠনিক উৎসের চেয়ে এর সামাজিক ভিত্তিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তাদের যুক্তি সহজ—যদি হাজার হাজার তরুণ রাস্তায় নামে, তাহলে প্রথমে তাদের ক্ষোভের কারণ বুঝতে হবে। কে তাদের সংগঠিত করেছে, সেটি দ্বিতীয় প্রশ্ন।
এই জায়গাটিতেই বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনের সঙ্গে সবচেয়ে বড় মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
প্রথম দিকে অনেকেই কোটা আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র খুঁজেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা প্রমাণ করেছিল, আন্দোলনের শক্তি এসেছিল সাধারণ শিক্ষার্থী ও তরুণদের ক্ষোভ থেকে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ভারতের জন্য কী বার্তা বহন করে?
বাংলাদেশে “রাজাকার” শব্দটি ছিল ক্ষমতার ভাষা। কিন্তু আন্দোলনকারীরা সেটিকে নিজেদের প্রতিরোধের ভাষায় রূপান্তর করেছিল।
ভারতে “তেলাপোকা” শব্দটিও একই রকম রাজনৈতিক যাত্রাপথে হাঁটছে।
অবশ্য দুই দেশের বাস্তবতা এক নয়। বাংলাদেশের আন্দোলন সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল। ভারতে সিজেপি এখনও একটি উদীয়মান সামাজিক-রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। এটি এখনো কোনো নির্বাচনী শক্তি নয়।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ভারতের তরুণ সমাজের একটি অংশ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং তারা প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে নতুন ভাষা, নতুন প্রতীক ও নতুন নেতৃত্ব খুঁজছে।
তাহলে ঢাকা থেকে দিল্লির দূরত্ব কত?
ভূগোলের হিসাবে ঢাকা থেকে দিল্লির দূরত্ব প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটার। কিন্তু রাজনীতির হিসাবে সেই দূরত্ব অনেক কম।
যখন ক্ষমতাসীনরা তরুণদের উদ্বেগকে অবজ্ঞা করে, যখন সমালোচনাকে অপমানজনক অভিধায় চিহ্নিত করা হয়, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক সংগঠনের নতুন প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে—তখন ঢাকা ও দিল্লির অভিজ্ঞতার মধ্যে অদ্ভুত মিল দেখা যায়।
“রাজাকারের নাতি” এবং “তেলাপোকা”—দুটি ভিন্ন শব্দ, দুটি ভিন্ন দেশ, দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।
কিন্তু উভয় ক্ষেত্রই আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: কোনো প্রজন্মকে অবমূল্যায়ন করা যায়, কিন্তু উপেক্ষা করা যায় না।
আজ ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো এটিই—ককরোচ জনতা পার্টি কি কেবল একটি ভাইরাল ডিজিটাল ঘটনা, নাকি এটি ভারতের নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশের সূচনা?
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অন্তত এটুকু বলে, যেসব আন্দোলনকে প্রথমে হাস্যকর বলে মনে হয়, ইতিহাসের পাতায় শেষ পর্যন্ত সেগুলোকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে লেখা থাকে।

Author