
২০২৫ সালের বড়দিনে এক বিশাল উচ্ছ্বসিত জনসমুদ্রের সামনে তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আমার দেশের মানুষের জন্য আমার একটি পরিকল্পনা আছে।’ ওই সময়েই তাঁর ১৭ বছরের নির্বাসনের অবসান ঘটেছিল। এর দুই মাসের কিছু কম সময় পর ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে।
বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৯টি আসন পায়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পায় ৬৮টি আসন। নতুন ছাত্রনেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) পায় ৬টি আসন। এই ভোট ছিল প্রায় দুই দশকের মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। এর আগে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ এমন নির্বাচনই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের উত্থানের পথ তৈরি করেছিল। ক্ষমতায় বসার পর হাসিনা উত্তরোত্তর কর্তৃত্ববাদী উপায়ে ক্ষমতা সুসংহত করেছিলেন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে এক গণ-অভ্যুত্থানের পর তাঁর ক্ষমতাচ্যুতি না হওয়া পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল ছিলেন।
শুধু নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে—এটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এর বাইরেও আরও একটি বড় বিষয় ঘটেছে। সেটি হলো ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জুলাই সনদ নিয়ে আয়োজিত গণভোটে ৬৮ শতাংশ ভোট এর পক্ষে পড়ে। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের নামানুসারে প্রণীত এই সনদে সাংবিধানিক, নির্বাচনী ও প্রশাসনিক সংস্কারের একটি প্যাকেজ রয়েছে, যা কিনা নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রস্তাব করেছিল।
জুলাই সনদের উদ্দেশ্য ছিল একজনের হাতে বা এক জায়গায় অতিরিক্ত ক্ষমতা জমা হওয়া বন্ধ করা। এ জন্য কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। যেমন প্রধানমন্ত্রী কতবার ক্ষমতায় থাকতে পারবেন, তা সীমিত করা; বর্তমান নির্বাচনী পদ্ধতির বদলে এমন ব্যবস্থা আনা, যাতে ভোটের অনুপাতে আসন পাওয়া যায়; সংসদকে দুই কক্ষে ভাগ করা; দল থেকে ভিন্নমত দিলেই সদস্যপদ হারানোর নিয়ম কিছুটা শিথিল করা ইত্যাদি। এসব পরিবর্তনের লক্ষ্য ছিল রাজনীতিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক করা।
একই সঙ্গে বিএনপির ফিরে আসা, জামায়াতে ইসলামীর আবার শক্তিশালী হওয়া এবং নতুন দল এনসিপির আবির্ভাব—সব মিলিয়ে বোঝা যায়, বাংলাদেশের মানুষ এখন বেশি অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি, সংস্কার, স্থিতিশীল অর্থনীতি ও সত্যিকারের গণতন্ত্র চায়। বড় ধরনের গণ-আন্দোলন বা বিপ্লব (বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনকে ‘মনসুন রেভোল্যুশন’ বলা হয়) সাধারণত অনেক আশা তৈরি করে। কিন্তু বাস্তবে সেই আশা অনেক সময় পুরোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে ধাক্কা খায়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল করতে পেরেছে এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করেছে। একই সঙ্গে তারেক রহমান প্রায় কোনো বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এটি দেখে মনে হয়, দেশে একটা স্থিতিশীল রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি হয়েছে। এটা শেখ হাসিনার সময়ের তুলনায় ভিন্ন। কারণ, তখন তিনি প্রায়ই বিরোধী দল ও ভিন্নমত দমন করতেন। তবে এখানেও একটা ধারাবাহিকতা আছে। কারণ, আবার ক্ষমতায় এসেছে একটি পুরোনো দল—বিএনপি। এই দলের নেতা তারেক রহমান হচ্ছেন দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে। উল্লেখ্য, তিনি নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার পাঁচ দিনের মাথায় খালেদা জিয়া মারা যান। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্য থেকে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এসেছে, সেই একই কাঠামোর মধ্য থেকে তারেক রহমান কি সত্যিই বড় ধরনের সংস্কার করতে পারবেন?
● অবিনাশ পালিওয়াল কার্নেগি সাউথ এশিয়া প্রোগ্রামের নন-রেসিডেন্ট স্কলার। তিনি লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রিডার।

Author