
মিসরের কোচ হোসাম হাসান কোন রাখডাক করেননি। বলেছেন, তাদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। মেসিকে বিশ্বকাপে রাখতে চেয়েছে ফিফা।
দলটির খেলোয়াড়রা বলছেন, তারা জুলুমের শিকার। রেফারিকে জালিম আখ্যা দিয়েছেন ফরোয়ার্ড জিকো।
তাবৎ দুনিয়ায় চলছে বিতর্ক।
বিতর্কিত সব কটি ঘটনার বিশ্লেষণ করেছেন, সাবেক সিলেক্ট গ্রুপ রেফারি অ্যান্ডি ডেভিস। ইএসপিএনে নিজের রায়ও দিয়েছেন তিনি।
পড়ুন তার মতামত-

মিসরের গোল কেন বাতিল হয়েছিল?
খেলার তখন ৬২তম মিনিট। মিসরের ফরোয়ার্ড মোস্তাফা জিকো বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা একটি গোল করেছেন বলেই মনে হচ্ছিল। সেই গোলে মিসর ২-০ ব্যবধানে এগিয়েও যায়। কিন্তু ভিএআরের হস্তক্ষেপে গোলটি বাতিল করা হয়। কারণ, গোল হওয়ার আগে আক্রমণ গড়ে ওঠার সময় মিসরের ডিফেন্ডার মারওয়ান আত্তিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের বিরুদ্ধে ফাউল করেছিলেন।
ভিএআরের সিদ্ধান্ত
ভিএআর জানায়, গোল হওয়ার আগে ফাউল হয়েছিল। তাই রেফারিকে মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি পর্যালোচনা করতে বলা হয়। ভিডিও দেখে রিভিউ শেষ করার পর রেফারি গোলটি বাতিল করেন।
ভিএআর পর্যালোচনা
ভিএআরের মতে, আত্তিয়া একই সময়ে মার্তিনেজের জার্সি টেনে ধরেন এবং তাঁর পায়ের ওপর পা রাখেন। দুটি ঘটনাই ফাউল হিসেবে বিবেচিত হয়। ভিডিও দেখার পর ফরাসি রেফারি লেতেক্সিয়ে ভিএআরের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হন এবং গোলটি বাতিল করেন।
ডেভিসের রায়
ভিএআরের হস্তক্ষেপ যথাযথ ছিল। গোল বাতিলের সিদ্ধান্তও সঠিক। আত্তিয়ার স্পষ্ট ফাউলের কারণে আর্জেন্টিনা আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ হারায়। সেই ফাউলের সরাসরি ধারাবাহিকতায়ই মিসর গোলটি করেছিল। তাই ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী গোলটি বাতিল করাই সঠিক সিদ্ধান্ত।
ঘটনাটি পেনাল্টি বক্স থেকে অনেক দূরে, মিসরের নিজেদের অর্ধে ঘটেছিল বলে এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তবে একই আক্রমণপর্বে যদি কোনো ফাউলের সরাসরি ফল হিসেবে গোল হয়, তাহলে সেই গোল বাতিল করতে হয়। রেফারিকে যখন একসঙ্গে জার্সি টানা ও পায়ের ওপর পা রাখার দৃশ্য দেখানো হয়, তখন তাঁর পক্ষে আগের সিদ্ধান্ত, অর্থাৎ গোল বহাল রাখা, সম্ভব ছিল না।
আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের আগে কেন ফাউল ধরা হয়নি?
ম্যাচের শেষ দিকে মিসর দুটি পৃথক ঘটনায় ফাউলের আবেদন জানায়। এর একটি ঘটে যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ গোল করার আগে। দুটি ঘটনাই আর্জেন্টিনার পেনাল্টি এলাকার ভেতরে ঘটে।
প্রথম ঘটনায় আর্জেন্টিনার আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টারকে মিসরের হামদি ফাতির জার্সি টানতে দেখা যায়। এরপর ফাতি মাটিতে পড়ে যান। তবে রেফারি কোনো ফাউল দেননি।
অন্য ঘটনায়, ম্যাচের একেবারে শেষ দিকে মোহাম্মদ সালাহ দাবি করেন, আর্জেন্টিনার পেনাল্টি এলাকায় ঢোকার সময় হুলিয়ান আলভারেস তাঁকে ফাউল করেছেন। কিন্তু রেফারির মতে, সেটি ফাউল দেওয়ার মতো ঘটনা ছিল না।
ভিএআরের সিদ্ধান্ত
ভিএআর দুটি ঘটনাই পরীক্ষা করে মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। অর্থাৎ, কোনো পেনাল্টি দেওয়া হয়নি।
ভিএআর পর্যালোচনা
ভিএআর বা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির জন্য ম্যাচটির শেষ অংশ ছিল বেশ কঠিন। বিশেষ করে ম্যাক আলিস্টারের ঘটনাটি মাঠের যে জায়গায় ঘটেছিল, তা একটি অদ্ভুত 'দ্বিমুখী পরিস্থিতি' তৈরি করেছিল। সেখানে রেফারি সিদ্ধান্ত বদলালে তার প্রভাব একসঙ্গে দুটি ক্ষেত্রে পড়ত। প্রথমত, আর্জেন্টিনার গোলটি বাতিল হতে পারত। দ্বিতীয়ত, ঠিক তার আগের মুহূর্তে মাঠের অপর প্রান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনার কারণে প্রতিপক্ষ একটি পেনাল্টিও পেয়ে যেতে পারত। কারণ, দুটি ঘটনাই একই আক্রমণপর্ব বা সিকোয়েন্সের মধ্যে ঘটেছিল।
তবে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডারদের আচরণ ও খেলার ধরন বিশ্লেষণ করে ভিএআর নিশ্চিত হয়, কোনো ঘটনাতেই হস্তক্ষেপ করার মতো স্পষ্ট ভুল হয়নি। তাই দুটি ক্ষেত্রেই তারা মাঠের রেফারির মূল সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
ডেভিসের রায়
রেফারি ও ভিএআরের জন্য ম্যাচের শেষ অংশটি কঠিন ছিল। তবে দুটি ক্ষেত্রেই তাঁরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে আমার মত। ম্যাক আলিস্টার ফাতির জার্সি টেনে কিছুটা ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তবে সেটি ছিল খুবই স্বল্প সময়ের জন্য। এতে ফাতির বল পাওয়ার সম্ভাবনা বা আক্রমণে অংশ নেওয়ার সক্ষমতার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি। তাই এটিকে পেনাল্টি দেওয়ার মতো ফাউল বলা যায় না।
একইভাবে সালাহকে পেনাল্টি না দেওয়ার সিদ্ধান্তও সঠিক। ওই ঘটনায় সালাহ ফাউলের চেয়ে পেনাল্টি আদায়ের চেষ্টাই বেশি করেছেন। আলভারেসের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো ফাউল ছিল না। দুজনের বুট একে অপরের সঙ্গে লাগে এবং দুই খেলোয়াড়ের গতির কারণেই সেই সংস্পর্শ তৈরি হয়। সালাহ এরপর অপ্রয়োজনীয়ভাবে মাটিতে পড়ে যান।
দুই ফাউলে ভিন্ন সিদ্ধান্ত কেন?
অনেকে ম্যাচের শেষের ঘটনাটির সঙ্গে মিসরের বাতিল হওয়া গোলের আগে আত্তিয়ার ফাউলের তুলনা করতে পারেন। তবে দুটি ঘটনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
প্রথম ঘটনায় একজন ডিফেন্ডার স্পষ্টভাবে প্রতিপক্ষের পায়ের ওপর পা রেখেছিলেন এবং একই সঙ্গে জার্সিও টেনেছিলেন। কিন্তু সালাহর ঘটনায় দুই খেলোয়াড়ের বুটের মধ্যে স্বাভাবিক সংস্পর্শ হয়েছিল, যা তাঁদের গতির ফল। তাই দুটি ঘটনাকে একইভাবে দেখা যায় না। এই কারণেই এক ক্ষেত্রে গোল বাতিল হয়েছে, আর অন্য ক্ষেত্রে খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তই সঠিক বলে বিবেচিত হয়েছে।
Author