
ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো রাজনৈতিক দলের নিবন্ধিত কর্মী নই, সরাসরি মিছিলে গিয়ে স্লোগান দেওয়া বা দলীয় তৎপরতায় অংশ নেওয়া অ্যাক্টিভিস্টও আমি নই। তবে আমার একটি নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ আছে, আছে দেশের ভালো-মন্দের প্রতি নিজস্ব পক্ষপাত ও বিরোধিতা।
আর একজন সামান্য লেখক-সাংবাদিক হিসেবে সেই মত ও দ্বিমত প্রকাশের একমাত্র হাতিয়ার ছিল আমার কলম। কিন্তু শেখ হাসিনার আওয়ামী রেজিমের ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনে শুধু লেখার অপরাধেই আমাকে যে মূল্য শোধ করতে হয়েছে, তা যেকোনো ঘোরতর রাজনৈতিক কর্মীর চেয়ে কম ছিল না।
সেই দুঃসহ দিনগুলোয় কেবল ভিন্নমত পোষণের কারণে গুলশানে বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে টানা তিন মাস অবরুদ্ধ থাকতে হয়েছিল আমাকে। আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছিল শতাধিক মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা। রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মম নির্যাতন নেমে এসেছিল আমার পরিবারের ওপর। বছরের পর বছর কাটাতে হয়েছে ফেরারি ও পলাতক জীবন। স্বজন-পরিজন ও চিরচেনা চারপাশ ছেড়ে বাধ্য হয়েছিলাম সুদূর প্রবাসে নির্বাসিত হতে। এই দীর্ঘ নিপীড়নে শরীর ভেঙে পড়েছিল গুরুতর অসুস্থতায়, আর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতায় আমার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।
সে সময় পুরো বাংলাদেশটাই যেন একটা সুবিশাল কারাগারে পরিণত হয়েছিল। ফ্যাসিবাদের দানবীয় থাবায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিল সাধারণ মানুষের অধিকার। গোটা দেশ স্পষ্ট দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল—একদিকে ছিল চরম ক্ষমতাবান ‘শাসক ও জালেম’ গোষ্ঠী, অন্যদিকে অধিকারহারা, কোণঠাসা ‘শাসিত ও মজলুম’ জনতা। চারদিকে ভীতি, গুম আর ক্রসফায়ারের এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে যেকোনো ন্যায়সংগত আওয়াজও স্তব্ধ করে দেওয়া হতো মুহূর্তেই। আমরা, যারা মুক্তির স্বপ্ন দেখতাম, এক গভীর ও অন্তহীন নৈরাশ্যের অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিলাম দিন দিন। মনে হচ্ছিল, এই ফ্যাসিবাদের সূর্য বোধহয় আর কোনোদিন অস্ত যাবে না।
এবং অবশেষে, আমরা দীর্ঘকাল পর বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার মতো মুক্ত এক বাংলাদেশ পেলাম।
যে জুলাই আমাদের অবরুদ্ধ জীবনের অবসান ঘটিয়েছে, যে জুলাই কোটি কোটি মজলুম মানুষের গলার শিকল ভেঙে দিয়েছে, সেই জুলাই আর কেবল ক্যালেন্ডারের কোনো পাতা নয়—তা আমার, আমাদের সবার আত্মপরিচয়।
আজকের এই মুক্ত বাতাসে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারেন—জুলাইয়ের সব স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা কি পূরণ হয়েছে? যে অপরিমেয় আত্মদান, শত শত তরুণের তাজা রক্ত আর হাজারো মানুষের পঙ্গুত্ব বরণের ত্যাগ, তা কি পুরোপুরি সার্থক হয়েছে?
নিষ্ঠুর সত্য হলো, বিপ্লবোত্তর কাঙ্ক্ষিত সব পরিবর্তন হয়তো এখনো আমাদের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছায়নি। রাষ্ট্র সংস্কারের পথটা দীর্ঘ এবং মন্থর। কিন্তু তাই বলে কোনোভাবেই বলা যাবে না যে ‘জুলাই ব্যর্থ হয়েছে’। জুলাই কখনোই ব্যর্থ হতে পারে না, কারণ যে মুক্তির স্বাদ আজ আমরা পাচ্ছি, তা কোনো মিথ্যে বা মায়া নয়।
আজ আমাকে আর মিথ্যা মামলার ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয় না।
আজ প্রবাসের নির্বাসন ভেঙে নিজের মাতৃভূমিতে ফেরার অধিকার মিলেছে।
আজ জালিমের আক্রোশ থেকে আমার পরিবার নিরাপদ।
আর কিছু না হলেও মানুষ ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠন ও বদলের অধিকার এবং সমালোচনা ও প্রতিবাদের স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে। প্রতিকারহীন অন্যায়, অবিচার, জুলুম, নির্যাতনের বিচার শুরু হয়েছে। ফিরেছে কৈফিয়ত ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি।
এই যে কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাস আজ স্বস্তিতে রূপ নিয়েছে, এই যে আমরা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছি—এটাই জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান সার্থকতা। স্বপ্ন পূরণের লড়াইটা চলমান, কিন্তু মুক্তির এই ভিত্তিপ্রস্তরটি স্থাপন করে দিয়েছে জুলাই। তাই শত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও বুক ফুলিয়ে, গর্ব করে বলা যায়—জুলাই আমাদের ছিল, জুলাই আমাদেরই আছে।
ইতিহাসের পাতায় এই জুলাই চিরকাল বেঁচে থাকবে আমার এবং আমাদের হয়ে।
লেখক: সম্পাদক প্রতিদিনের বাংলাদেশে, বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক প্রেসসচিব

Author