
১৭ জুলাই। ঝিরঝিরি বৃষ্টি আর মনের ভয় যেন গোধূলিলগ্নেই গভীর রাতের তীব্রতা নামিয়ে এনেছিল সেদিন। সে সন্ধ্যা গাঢ় অন্ধকার কালরাত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে হাহাকার ছড়াচ্ছিল। কচি প্রাণের আহাজারি-রোনাজারিতে আসমান আরও বেশি ভারী হচ্ছিল। শহরজুড়ে ফিসফাস-আতঙ্ক—কী ঘটছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে? সম্মিলিত সরকারি বাহিনীর গুলির মুখে তারা কি টিকতে পেরেছে? না রণে ভঙ্গ দিয়ে ছত্রভঙ্গ? শ্বাসরুদ্ধকর এক দুঃসময়।
নেট বন্ধ থাকায় সন্ধ্যা নামার আগেই চারপাশ থেকে ধেয়ে আসে অন্ধকার—ডালপালা মেলে গুজব। সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সমান্তরালে অত্যাচার চলছিল জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর। ততক্ষণে জানা হয়ে গেছে, পুলিশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হলগুলো গুলির মুখে খালি করেছে। আন্দোলনের চিরচেনা পুরোনো এক কৌশল আবারও সফল। হল খালি তো আন্দোলনের মাঠ খালি!
রাত সোয়া ৯টার মতো হবে সময়। অল্প কিছু শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলক্ষেত মোড় গেটে জড়ো হয়েছে। ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা কিছুটা বাড়ে। তারা পুলিশকে কাকুতি-মিনতি করে ভেতরে আটকা পড়া বন্ধুরা কেমন আছে, তা জানতে ভেতরে যেতে চায়। পুলিশ রাজি না হলে তাদের মধ্যে থেকে দুজনকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ করে। পুলিশ সময় চেয়ে নেয়। বোঝার চেষ্টা করে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কত। তাদের নীলক্ষেতের দিকটায় অপেক্ষা করতে বলে।
এর মধ্যে পুলিশের ফোর্স বাড়ায়। হঠাৎ কথা বলার ছলে আক্রমণ শুরু করে। বেশ কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীকে লাঞ্ছিত করা হয়। আটক হয় অনেকে। শুরু হয় দিগ্বিদিক ছোটাছুটি। একই সঙ্গে ভেঙে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা শেষ প্রতিরোধব্যূহ।
পুলিশ ছিল প্রচণ্ড মারমুখী। তাদের হাত থেকে বাঁচতে আমিও পলাশীর দিকে ট্রাইপড হাতে দৌড়াই। কিছুটা সময় নেই। অবস্থা স্বাভাবিক হতে শুরু করলে নীলক্ষেতের দিকে ফিরে আসি। কয়েকজন রিকশাওয়ালা আমাকে ওদিকে যেতে বারণ করে। নীলক্ষেত মোড় পার হতে এসে দেখি, পুলিশ কয়েক খণ্ডে বিভক্ত হয়ে এখনো থেমে থেমে টিয়ারশেল ছুড়ছে। তবে তাদের বড় দলটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের দিকটায় সরে গেছে।
রাত ১০টা ছুঁই ছুঁই হবে বোধহয়। নীলক্ষেত এলাকা ছেড়ে আসতে গিয়ে টের পাই, চোখ অশ্রুতে ভরা। ভাবছিলাম, কী অবলীলায় আরেকবার স্বৈরাচার টিকে গেল। এর মধ্যে কত রক্ত ঝরল, কত মায়ের বুক খালি হলো। শুধু তার কিছু হলো না। এই পার পেয়ে যাওয়া দিনে দিনে তাকে অহংকারী থেকে আরও বড় অহংকারী করতে দেখলাম।
বাসায় যখন দীর্ঘ ক্লান্তিতে নুয়ে পড়া এক দেহ নিয়ে ফিরছি, তখন যেন দেহের চেয়েও বেশি ভারী হয়েছিল মনটা। এমন অবসাদে ঠিকমতো নিশ্বাসও নেওয়া যায় না। এ সময় বন্ধু হোসাইন আজাদ খবর দেয়, জনতা যাত্রাবাড়ীতে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ওই এলাকায় সংঘর্ষ চলছে। থানা থেকে পুলিশ পালিয়ে গেছে।
ইন্টারনেট বন্ধ বলে প্রকৃত অবস্থাটা জানা হয় না। তবে ঘোর অমানিশার মধ্যে যেন খানিকটা আলোর দিশা পাই। বাসায় ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম, ঠিক কী মনে করে যাত্রাবাড়ীর সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। সেখানে তো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। ওভাবে স্কুল-কলেজও না। সাধারণ মানুষ, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার ছাত্র একসঙ্গে যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনে নেমেছে।
হামলার সূত্রপাত নাকি মসজিদে ঢুকে মুসল্লিদের ওপর পুলিশের হামলা থেকে। পুলিশ বড় ভুল করেছে। মসজিদে ঢুকে করা ওই হামলা থেকেই ওই এলাকায় দাবানলের মতো বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
শুধু যাত্রাবাড়ী দিয়ে কি এ আন্দোলন টিকবে? আমি পরিস্থিতি সামলে নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর অত্যাচারের স্টিম রোলার চালানোটা কল্পনা করে আঁতকে উঠছিলাম। পরদিনও হয়তো কিছু কর্মসূচি পালিত হবে। তারপর সব স্তিমিত হয়ে আসবে। তিনি সংবাদ সম্মেলনের নামে তামাশা করে জাতিকে নতুন কোনো রেসিপি চাপিয়ে দেবেন।
রাতে জানতে পারি, ঢাকার মোহাম্মদপুরস্থ ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ—ইউল্যাবের শিক্ষার্থীরা নতুন করে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ১৬ জুলাই ইউল্যাবের শিক্ষার্থীরা প্রথমবারের মতো সংহতি কর্মসূচি ঘোষণা করে। পরদিন ১৭ জুলাই তারা আবার রাস্তায় নামলে ছাত্রলীগ-যুবলীগ-পুলিশের যৌথ আক্রমণে অনেকে আহত হয়।
১৬ জুলাই ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ ঘোষণা করলে ইউল্যাব কর্তৃপক্ষ অনলাইন ক্লাসে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। শিক্ষার্থীরা সহপাঠীদের মৃত্যুর খবরে এতটা উত্তেজিত ছিল যে তাদের নিয়ে স্বাভাবিক ক্লাস করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বারবার করে বলছিল, ‘স্যার, আপনারা শিক্ষকেরা কেন চুপ করে আছেন? ইউল্যাব কর্তৃপক্ষ কেন কিছু বলছে না? আমরা চুপ করে থাকব না। আমরা ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে রাস্তায় নামব। এভাবে গুলি করে শিক্ষার্থী হত্যা মানা যায় না।’
আমি চুপচাপ এদের কথা শুনি আর বুঝতে পারি, আন্দোলনের আঁচ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও লাগতে শুরু করেছে। আর যাই হোক, ছাত্রহত্যার ঘটনার পর তাদের আর চুপ করিয়ে রাখা যাবে না।
মূলত ১৬ জুলাই থেকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একই দাবিতে রাস্তায় নামতে শুরু করে। ১৮ জুলাই যার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায়। ইউল্যাবে দেখেছি কবি ও লেখক ড. সুমন রহমান, সৈয়দা সাদিয়া মেহজাবিন, আন্দালিব পার্থ, দিদারুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান শিপুসহ অনেক শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের পাশে এসে সাহস নিয়ে দাঁড়াতে। রাস্তায় নেমে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদ করতে।
১৮ জুলাই আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে? আমার মন ভারাক্রান্ত। ১৭ জুলাই মধ্যরাতে গ্রিন ইউনিভার্সিটির সাবেক অধ্যাপক শিহাব স্যার ফোন দিয়ে বলেন, বিবেকের দংশন থেকে বাঁচার জন্য হলেও আমাদের কিছু একটা করা উচিত। আমরা আলাপ-আলোচনা শেষে যেকোনো মূল্যে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে রাস্তায় দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিই।
পরদিন সকালে বাসা থেকে বের হয়ে মোহাম্মদপুরের চারপাশটা বোঝার চেষ্টা করি। বেলা গড়াতে গড়াতে ইউল্যাবের সামনে আবারও শিক্ষার্থীরা নামে। এবার তারা সংঘবদ্ধভাবে এসেছে, যেন হামলা ঠেকানো যায়।
বিকেল ৩টায় গ্রিন ইউনিভার্সিটির শেওড়াপাড়ার সিটি ক্যাম্পাসের সামনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌথ কর্মসূচি। বেলা ১টার পর শিহাব স্যার ও আমি বাসা থেকে বের হয়ে যাই। আমরা দুজন। আর কে কে আসতে পারে হিসাব কষি। দেখতে দেখতে মিছিলের সাথি বাড়তে থাকে। মোবাইল ডাটা অফ বলে বাইরে বেরুলে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন। তখনো আসলে আন্দোলনের তীব্রতা ওভাবে টের পাইনি।
১৬ জুলাই কতগুলো লাশ পড়ল। ১৭ জুলাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কর্মসূচি পালন করতে পারেনি শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যা নামতে তাদের হল ছেড়ে কোথাও আশ্রয় নিতে হয়। অনেকে গ্রামের বাড়ি চলে যায়। ঠিক তখন রাতে যেন আবাবিল পাখি হয়ে যাত্রাবাড়ীতে নেমে এসেছিল হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। তারা শেষ প্রতিরোধ দেয়াল হয়ে সটান দাঁড়িয়ে ছিল।
আর পরদিন পুরো ঢাকা শহরকে যাত্রাবাড়ী-শনির আখড়ায় রূপ দেয় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রামপুরা থেকে উত্তরা পুরো রাস্তা চলে যায় তাদের দখলে। তারা পুলিশের সামনে বুক চিতিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নেয়, কিন্তু দাসত্ব মেনে নিতে রাজি হয় না।
খবরটা শুনে ঠিক যেন আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। বিকেলে যখন গ্রিনের সিটি ক্যাম্পাসের সামনে যাই, তখনো একটা দ্বিধা মনের মধ্যে। কিন্তু আস্তে আস্তে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সংখ্যা বাড়তে দেখে আমি আশাবাদী হই। গ্রিনের শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের নেতৃত্বে বিশাল মিছিল।
মিছিল শেষে সেখান থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থীসহ মিরপুর-১০-এ যাই। গিয়ে দেখি লাখ লাখ মানুষের দখলে মিরপুর-১০। মিরপুরে ছাত্রদের চেয়ে সাধারণ মানুষের সংখ্যাই বেশি। আবার ছাত্রদের মধ্যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আধিক্য।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখি, আশপাশের স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়েরা আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। একজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, সে তেজগাঁও কলেজের ছাত্র। এই এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কম ভেবে এখানে চলে এসেছে!
ফার্মগেটের মোড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সরকারি বিজ্ঞান, হলিক্রস, তেজগাঁও কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি চালিয়ে গেছে।
মিরপুরে থেমে থেমে পুলিশ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ যৌথ আক্রমণ করছিল। শিক্ষার্থীরাও সুযোগ বুঝে পাল্টা ধাওয়া দিচ্ছিল। একপর্যায়ে পুলিশের টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড থেকে বাঁচতে আমি মিরপুর-১০ থেকে কাজীপাড়ার দিকে দৌড় দিই। আমার সঙ্গে ছিল সেজু, জামান, ইমরান, নিবির, আশিকসহ আরও কেউ কেউ। এরা সবাই আমার ছাত্র ছিল। গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া কমিউনিকেশন বিভাগে পড়াশোনা করে।
এদিন আমার দুই শিক্ষার্থী ফাহিম ও হাদিউজ্জামান পুলিশি হামলায় গুরুতর আহত হয়।
দৌড়াতে দৌড়াতে দেখি, রাস্তায় একজন শিক্ষার্থী ‘পেস্ট, পেস্ট’ বলে গলা ফাটাচ্ছে। কারও কাছে পাওয়া গেল না দেখে তাকে নিয়ে মিনাবাজারে যাই। পেস্ট কিনে দিয়ে কিছু খাবে কি না জানতে চাই। সেও এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। থাকে মিরপুরে।
এরপর ওখানকার এক হাসপাতালে যাই আহত আন্দোলনকারীদের দেখতে। আহত অবস্থাতেই অনেককে ধরে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। আরও কিছুক্ষণ থেকে আমি শিক্ষার্থীদের পেস্টসহ কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দিয়ে মোহাম্মদপুরের দিকে ফিরে আসি।
তখনও জানি না, মোহাম্মদপুরের তিন রাস্তার মোড় থেকে শুরু করে টাউন হল পর্যন্ত হাজারে হাজারে জনতা রাস্তায় নেমে এসেছে। সকালে এই এলাকায় থাকলেও বিষয়টা আঁচ করতে পারিনি। দুপুরের পর এই এলাকায় (রেসিডেনশিয়াল কলেজ বা মোহাম্মদপুর মডেল কলেজের হবে) এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার স্থানীয় মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে।
সন্ধ্যার পর তিন দিক দিয়ে পুলিশকে ঘিরে ফেলে জনতা। পুলিশ মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে অবস্থান নিয়ে চারপাশে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, গুলি প্রভৃতি ছুড়তে থাকে।
মোবাইল ডাটা অফ। ফলে ফেসবুকে ছবি আপলোড দিতে বন্ধু ইহসান আব্দুল্লাহর বাসায় যাই। তার বাসায় গিয়ে দেখি, ওয়াইফাইও অফ। আমাকে পেয়ে সেও বাইরে বের হবে বলে রেডি হয়। আমরা এবার গণভবনের দিককার রাস্তায় যাই। রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ।
১৯ জুলাই সকালে বের হয়ে শাহবাগে যাই অভিভাবকদের একটি সমাবেশে যোগ দিতে। সমাবেশ শেষ করে অভিভাবকরা জাতীয় জাদুঘরের সামনে বিক্ষিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। তখন যুবলীগের একটি মিছিল আমাদের ওপর মারমুখী হয়। গায়ে পড়ে ঝগড়া যাকে বলে।
শাহবাগ থেকে আন্দোলনের হালহকিকত বুঝতে দৈনিক বাংলা যাই। দৈনিক বাংলা থেকে পরের গন্তব্য যাত্রাবাড়ী-শনির আখড়া। সেখানে গিয়ে কথা বলে জানতে পারি, যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত পুরো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক জনতার দখলে।
যাত্রাবাড়ী থেকে বঙ্গভবন হয়ে আবার বায়তুল মোকাররমে। জুমার পরে বায়তুল মোকাররমে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলনের সমাবেশ। আর নয়াপল্টনে বিএনপির। সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা যখন ফিরে যাচ্ছে, তখন পুলিশ অযথা তাদের ওপর আক্রমণ করে।
আক্রমণের মুখে বায়তুল মোকাররম পার হয়ে দক্ষিণ গেট দিয়ে মতিঝিল আসি। চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
মতিঝিল থেকে নটর ডেম পার হয়ে আরামবাগের দিকে যাই। আরামবাগে গিয়ে দেখি, পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি ছোট্ট গ্রুপের সংঘর্ষ চলছে। সামনে এগিয়ে যাই ঘটনাটা বুঝতে। শুরু হয় পুলিশের আক্রমণ। দৌড় দিই। রাবার বুলেট পিঠে এসে লাগে।
এই এলাকায় কিছুক্ষণ থেকে কাকরাইল যাই। কাকরাইলে বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলছে। কাকরাইল থেকে আন্দোলনের অন্যতম হটস্পট রামপুরার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। সব পথ বন্ধ।
রামপুরায় ঢুকতে না পেরে হাতিরঝিল হয়ে বাড্ডার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করি। বাড্ডায় গিয়ে দেখি পুরো এলাকা রণক্ষেত্র। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আগের দিনই রাজপথ দখলে নিয়েছিল। তবে নিজ চোখে না দেখলে তার মাত্রা বোঝা সম্ভব হতো না।
১৯ তারিখ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। পুরো সড়ক শিক্ষার্থীদের দখলে। পুলিশ-বিজিবি কিছু নির্দিষ্ট পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে টিয়ারশেল-গুলি ছুড়ছে।
বাড্ডা থেকে হেঁটে হেঁটে নতুন বাজারের দিকে যাই। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর একটা রিকশা পাই। রিকশায় করে কিছুটা যাওয়ার পরে আবার হাঁটি। চারপাশে পোড়া গন্ধ। মানুষের মুখে মুখে পুলিশের নৃশংসতা।
নতুন বাজারে পৌঁছে দেখি, পুলিশের সঙ্গে বিজিবির বিশাল এক বহর আক্রমণ শানাচ্ছে। ওভারব্রিজ পার হয়ে ওপাড়ে যেতে চাইলে কয়েকজন বিজিবি সদস্য বাধা দেন। পরে আবার দ্রুত যেতে বলেন। আমি রাস্তা পার হই।
ভাটারা থানার দিকে মুখ করে দাঁড়ালে বাঁ পাশের রাস্তার পুরোটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দখলে। আমি থানা পার হয়ে বন্ধু হুসাইন আজাদের বাসায় যাব বলে রিকশা খুঁজি। রাস্তায় মানুষ কম—চোখে-মুখে আতঙ্ক। কয়েক জায়গায় পুলিশের ব্যারিকেড।
পাশের বাজারের গলি দিয়ে ভেতরে ঢুকতে শুরু হয় পুলিশের আরেক দফা আক্রমণ। টিয়ারশেলের ধোঁয়ায় যেন অন্ধ হয়ে গেছি। কিছুক্ষণ এভাবে দৌড়ানোর পর পাশেই জ্বলতে থাকা আগুনের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়াই। তারপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হাঁটা শুরু করি।
হাঁটতে হাঁটতে আরও ভেতরে গেলে রিকশার দেখা মেলে। তারপর ছোলমাইদ। ছোলমাইদ যেতে যেতে শুনি, এই এলাকায়ও ছাত্ররা অবস্থান নিয়েছে। হামলা হয়েছে ভাটারা থানাতেও। হুসাইন আজাদের বাসায় যেতে যেতে রাত ৮টা।
বাসায় গিয়ে শুনতে পারি, সরকার কারফিউ ঘোষণা করেছে। সেনাবাহিনী নামছে রাস্তায়। রামপুরায় তখনো সংঘর্ষ চলেছে। আমি আবার বাসা থেকে বের হই বসুন্ধরা এলাকায় কী অবস্থা, সেটা জানতে।
বসুন্ধরার এই এলাকাটাও ছিল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের দখলে। বাড্ডা এলাকা ছিল ইস্ট ওয়েস্ট ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দখলে। নতুন বাজার এলাকা ছিল ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। বসুন্ধরা এলাকা ছিল নর্থ সাউথ, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশসহ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের দখলে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল হাজার হাজার জনতা।
আসলে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও প্রত্যক্ষ সাহায্য এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়া ছাত্রদের পক্ষে মাঠে দীর্ঘ সময় লড়াই করা সম্ভব ছিল না।
কিছুক্ষণ এই এলাকা পর্যবেক্ষণ করে একটি অনলাইন পোর্টালের অফিসে যাই দেশের হালহকিকত জানতে। ওয়াইফাইও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে পোর্টালের কার্যক্রম বন্ধ। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো উল্টাপাল্টাই। যদি নতুন কোনো তথ্য মেলে।
কোনো টিভিতে চলছে গানের অনুষ্ঠান বা শোবিজ তারকা কথন। কোথাও লটকন বা লেবুর বাম্পার ফলন শো। আবার কোথাও টকশো। দু-একটি চ্যানেলে বাংলা ছবি চলছে। টিভি দেখে বোঝার উপায় নেই, একটি দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে। শত শত ছাত্র ততক্ষণে নিহত।
জানার মধ্যে যা জানা গেল, তা হলো, রামপুরায় পুলিশের ওপর দুর্বৃত্তদের হামলা। দুজন নিহত। অগত্যা ধৈর্য হারিয়ে আবার রাস্তায় নেমে আসি।
কোথায় আছে, কেমন আছে জানতে ছাত্র নাইমকে ফোন দিই। নাইম বসুন্ধরার গেটে এলে তার কাছ থেকে এখানকার আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি জানি। সে জানায়, সবাই নর্থ সাউথের একটা গলির সামনে জড়ো হয়। ইন্টারনেট না থাকায় কলে, এসএমএসে একজন আরেকজনকে সময় জানিয়ে দেয়।
তখনো পর্যন্ত নর্থ সাউথের সামনে পুলিশ সেভাবে আক্রমণ করেনি। আমি থাকতে থাকতে দু-একবার পুলিশ টিয়ারশেল ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেছে বটে। তবে আক্রমণের তীব্রতা ছিল কম।
পরদিন সকালে যখন ছোলমাইদ থেকে মোহাম্মদপুর ফিরব বলে বের হই, দেশে তখন প্রথম দফার কারফিউ শুরু হয়ে গেছে। ছোলমাইদ থেকে ভাটারা থানার সামনে এসে দেখি, হাজার হাজার মানুষ কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে এসেছে।
আমি রাস্তা পার হব। তার আগেই আক্রমণ শুরু করে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ। মানুষ ছোটাছুটি শুরু করে। আমি ছোটাছুটির মধ্যেই রাস্তা পার হব বলে মেইনরোড ধরে হাঁটা দিই।
আমার দিকে তেড়ে আসে পুলিশের এক অফিসার। পাশেই আরেক অফিসার দাঁড়ানো। আর সেনাবাহিনীর একটা টহল দল। পুলিশ ও বিজিবির বহরটা মানুষকে দৌড়াচ্ছে। সে লাঠি দিয়ে আমাকে আঘাত করতে শুরু করে। হয়তো ভেবেছিল, বাড়ি খেয়ে আমি দৌড় দেব। কিন্তু আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি।
জিজ্ঞাসা করি, ‘কেন মারছেন আমাকে? আর কাকে মারছেন আপনি?’
পুলিশ অফিসার কিছুটা ভরকে যায়। একটু বিরতি দিয়ে আবার পেটাতে শুরু করে। আমি দাঁড়িয়েই থাকি। পাশে থাকা অপর পুলিশ অফিসার আমাকে সামনে যেতে ইশারা করে।
সেদিন কারফিউ ভেঙে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে, কিছুটা পথ রিকশায় করে কয়েক ঘণ্টা পর অবশেষে মোহাম্মদপুর এসে পৌঁছাই। ব্যথায় কুঁকড়ে আছি। ডিসপেনসারি থেকে ব্যথার অ্যান্টিবায়োটিক এনে বাসায় ফিরি। তারপর ওষুধের প্রভাবে কি না জানি না, গভীর ঘুমে তলিয়ে যাই।
ঘুম থেকে উঠে আবার রাস্তায় বের হই। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে যাই আন্দোলনের অবস্থা বুঝতে। বাসস্ট্যান্ড থেকে টাউন হলের রাস্তাটা খালি। তিন রাস্তা মানুষের দখলে। বাঁশবাড়ির দিকটা পুলিশ অভিযান চালিয়ে খালি করেছে বলে জানাল স্থানীয়রা।
তবে মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার দিকে আন্দোলনের শেষ দিন পর্যন্ত সুবিধা করতে পারেনি পুলিশ। পুরো বসিলা অঞ্চল ছিল মানুষের দখলে। হেলিকপ্টার থেকে গরম পানি, গুলি, বোমা ছুড়েও কাজ হয়নি।
আন্দোলনের দিনগুলোতে ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে মিরপুর-১০। কখনো মিরপুর-১০ থেকে ফার্মগেট হয়ে শাহবাগ। শাহবাগ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এরিয়া হয়ে আবার মোহাম্মদপুরে ফিরে এসেছি। পুরো ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়েছি। ফোনে ফোনে বিভিন্ন জায়গার খবর নিয়েছি। বোঝার চেষ্টা করেছি আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি। আমার ছাত্রদের খোঁজ-খবর নেওয়ার চেষ্টা করেছি।
সে সময় আমি প্রত্যক্ষ করেছি—১৭ জুলাইয়ের পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তারা ক্যাম্পাসগুলোতে যেতে পারছিল না। একটা বড় অংশ গ্রামে ফিরে গিয়েছিল। আরেকটা অংশ জনতার সঙ্গে মিশে রাস্তায় ছিল।
তখন আন্দোলনের নেতৃত্ব চলে গিয়েছিল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে। তারাই ছিল ছাত্রদের মেইন ফোর্স। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল।
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও মালিকদের একটা অংশ যখন সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছিল, তখন হাজার হাজার কওমি শিক্ষার্থীকে রাস্তায় নেমে আসতে দেখেছি। যাত্রাবাড়ীতে যে আন্দোলন হয়েছিল, সে আন্দোলনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ফোর্স ছিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। আর এভাবেই দেশের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে জুলাই সফলতার মুখ দেখে।
আজ জুলাইয়ের রাজপথের যুদ্ধ শেষে পাওয়া ‘বোনাস জীবন’ থেকে এ স্মৃতিকথা লিখতে এসে এতটুকু বলতে পারি, জুলাই বিপ্লবের উদরে জন্ম নেওয়া যে নতুন বাংলাদেশ তথা বাংলাদেশ-২.০-এর কথা আমরা বলছি, সে বাংলাদেশ বিনির্মাণের সূচনা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা করেছিল ঠিকই। কিন্তু এর চূড়ান্ত সফলতার মূল নায়ক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
এ আন্দোলন যখন তার গতিপথ হারিয়ে প্রায় থেমে গিয়েছিল, ঠিক তখন যাত্রাবাড়ীতে আবাবিল পাখির মতো হাজার হাজার সাধারণ মানুষ দাঁড়িয়ে যায়। দুনিয়ার মুক্ত কারাগার গাজায় যেমন একদল মানুষ বুক উঁচিয়ে বিনা অস্ত্রে পাথর হাতে ইসরাইল-আমেরিকা ডেভিল শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছে। আর পরদিন সে লড়াইয়ের ইয়াহিয়া সিনওয়ার, মোহাম্মদ দেইফ বা আবু ওবায়দা হয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিল। তারা জনতার সঙ্গে মাঠে থেকে এ আন্দোলনের হৃদয় হয়ে এ জনপদকে মহিমান্বিত করেছে।
যাত্রাবাড়ী-শনির আখড়াকে যদি আপনি বলেন এ বিপ্লবের স্টালিনগ্রাদ, তাহলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকজন শিক্ষার্থী হলো সে ব্যাটলফিল্ডের অসীম সাহসী এরতুঘরুল গাজী। নতুন বাংলাদেশ এ বীরদের যেন ভুলে না যায়।
(লেখক: শিক্ষক ও কথাশিল্পী।)
Author