
আমার মা একদম মানসিক চাপ নিতে পারেন না। সামান্য টেনশনেই তাঁর emotional breakdown হয়। প্রতি নির্বাচন এলেই আম্মুর প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পড়ত। কলেজ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেও লাভ হতো না। আম্মু প্রতিবারই আতঙ্কিত হয়ে অস্থির হয়ে যেতেন। রাতের ভোট, ভোট ছাড়া সিল দিয়ে ব্যালট ভর্তি করা—এসব আমার মা সহ্য করতে পারতেন না।
আমার বাবা-মা এমন নীতির মানুষ, যারা জীবনে মরে যাবেন, তবু আপস করবেন না—এ কথা তাঁদের কাছের মানুষ জানেন। যেহেতু আম্মুর sciatica আছে, তিনি hypertension-এর রোগীও, তাই আমরা বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করে কোনো রকমে বিষয়টি সামলানোর চেষ্টা করতাম।
কিন্তু সমস্যা হলো, এরপর শুরু হতো আসল কাহিনি। কিছুদিন পরপর অডিটের নাম করে কেউ না কেউ এসে তদন্ত করত—আম্মুর কী সমস্যা, তিনি কোন দল করেন। আর যেহেতু আম্মু নিকাব পরেন, তাই অনেক কিছু অনুমান করা সহজ হতো।
কেউ বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, আমরা যখন রাজনীতি নিয়ে তেমন কিছুই ভাবতাম না, তখন থেকেই আমার মা নামাজে দোয়া করতেন—এই দুঃশাসনের যেন শেষ হয়।
তা জুলাই আমাদের কী দিল?
আমার মা এবার আগ্রহ নিয়ে নির্বাচনের কাজ করতে চাইছেন। তাঁর বহু বছরের দোয়া কবুল হয়েছে। তিনি এখন খুশিমনে দেশের খবর দেখেন। আমার কাছে এটাও জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলোর একটি।
এ রকম বহু ছোট ছোট গল্প আছে প্রতিটি মানুষের। কারও হয়তো গেস্টরুমের নামে হলে নির্যাতনের গল্প, কারও হয়তো কর্মস্থলে রাজনৈতিক আলাপ করতে না পারার গল্প, কারও হয়তো নিজের লোক না বলে ব্যবসার এলসি খুলতে না পারার গল্প। এসব কিছুরই প্রতিক্রিয়ার বিস্ফোরণ ছিল জুলাই।
জুলাইয়ে আমি তেমন কী-ই বা করতে পেরেছিলাম?
আমি জুলাইয়ের আগ থেকেই যাত্রাবাড়ীর একটি ক্লিনিকে কাজ করতাম। বিএমইউতে ক্লাস শুরু হলো জুলাইয়ে। বললাম, আপনারা ডাক্তার দেখে নিন। তাঁরা এক মাস সময় নিলেন। বললেন, কোনো রকমে একটা মাস চালিয়ে নিন। আমি দুপুর আড়াইটায় ডিউটি শেষ করে সাড়ে তিনটার দিকে যাত্রাবাড়ী যেতাম। এর মধ্যেই জুলাই এসে গেল।
আমাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষ হবে—এই আশায় শুরু হলো সেই ঘোরলাগা অধ্যায়।
যাত্রাবাড়ীতে আমি যা দেখেছি, তার কোনো তুলনা হয় না। মানুষের সাহসিকতা, দৃঢ়তা, একই সঙ্গে ভয়াবহ নির্মমতা। আমরা এতটাই অসহায় ছিলাম যে বুঝতাম, রেফার করলে রোগী টিকবে না। তাই কোনো রকমে রক্তক্ষরণ বন্ধ করে, fluid support দিয়ে একটু স্থিতিশীল করে রেফার করতাম। কিন্তু রেফার করার পরও রোগীর পরিণতি কী হবে, তা অনিশ্চিত। কোথাও কোনো সাপোর্ট নেই, লজিস্টিক নেই।
মানুষের সেই চিৎকারের PTSD আমার এখনো কাটেনি। কী কষ্ট! কী কষ্ট!
আমার বাবা, যিনি একটি day tour-এ গেলেও হাজারবার ফোন দিতেন কখন ফিরব, তিনিই প্রতিদিন আমাকে নিয়ে আসতেন। যাতায়াতের পথে নিয়মিত গালাগালির মধ্যে পড়তাম। রাতে এসে আব্বু বলতেন, এভাবে যাওয়া-আসা ঠিক না, ঝুঁকি হয়ে যায়। যারা যাত্রাবাড়ীতে ছিলেন, তারা জানেন—রাতবিরাতে অলিগলিতে সরাসরি গুলি করা হতো।
অনেক কথা বললেও আমার বাবা ঠিকই পরের দিন যেতে দিতেন।
শেষ ৫ তারিখের পর আব্বু গল্প করতে করতে বলেছিলেন, "আমি যদি তোমাকে যেতে মানা করি, আর ডাক্তার আছে এই আশায় ওই ক্লিনিক থেকে কোনো মুমূর্ষু আহত মানুষ ফিরে যায়?"
তারপর শেষদিকে এসে আমার বোনের সুবাদে আমাদের বাসায় DGFI-এর নজরদারি, অসংখ্য WhatsApp ও Telegram গ্রুপের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। কাউকে চিনতাম না, কিন্তু মনে হতো কত আপন!
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সময় হাজার হাজার টেক্সট মেসেজ। কী মারাত্মক, অদ্ভুত, ঘোরলাগা দিনগুলো!
কতগুলো অপরিচিত মানুষ আত্মার আত্মীয় হয়ে গেল। আবার অনেক চেনা মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই দূরত্ব তৈরি হলো। জীবনটাই বদলে গেল।
তা জুলাই কী দিল? দুই বছরে কী এমন পরিবর্তন হলো?
এটা চিন্তা করলে আমাদের দেখার লেন্স বদলাতে হবে। ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য সুবর্ণচরে ধর্ষণের শিকার সেই গৃহবধূর চোখ দিয়ে, গণরুম-গেস্টরুমের নির্যাতনের শিকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চোখ দিয়ে, আবরার ফাহাদের মায়ের চোখ দিয়ে, কার্টুনিস্ট মুশতাকের পরিবারের চোখ দিয়ে, বুকে ১৫টি গুলি খেয়ে মারা যাওয়া ছাত্রনেতার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর চোখ দিয়ে, স্বামীকে ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে আটকে রেখে দিনের পর দিন স্ত্রীকে ধর্ষণের কাহিনি দিয়ে, একটি মাত্র statement দেওয়ার জন্য তিন বছর জেল খেটে ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়া খাদিজার চোখ দিয়ে, গুমের শিকার ব্যক্তির সন্তানের চোখ দিয়ে জুলাইকে দেখুন। উত্তর পেয়ে যাওয়ার কথা।
চাওয়া-পাওয়ার হিসাব দিয়ে যারা গণঅভ্যুত্থানকে মাপতে যান, তাঁদের জন্য আমার একটি সাজেশন।
কাউকে গুম করার পর কিছুদিন স্বজনরা এদিক-ওদিক ছুটতেন, পুলিশকে ঘুষ দিতেন, পারলে প্রশাসনের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। কিন্তু কোথাও কোনো উপায় না পেয়ে, বিশেষ করে যেগুলো রাজনৈতিক গুম, সেসবের স্বজনরা র্যাব-১-এর সামনে বসে থাকতেন।
অদ্ভুত ব্যাপার কী জানেন? র্যাব-১-এর অফিসের সামনে বসে থাকতেই অনেক মা-বোন এক ধরনের মানসিক শান্তি পেতেন। তখন তো কেউ জানত না, ওই অফিসের কাছেই ছিল সবচেয়ে বড় আয়নাঘর। পরে তারা বুঝতে পেরেছেন, সম্পর্কটা মিলিয়ে নিতে পেরেছেন।
ধীরে ধীরে কেউ কেউ হাল ছেড়ে দিতেন। কারও লাশ পাওয়া যেত তথাকথিত 'ক্রসফায়ারের' পর কোনো দুর্গম স্থানে, কিছু গোলাবারুদের পাশে।
একজন ভুক্তভোগী হিসেবে বলি, সুসময়ে অনেক হিসাব করা সহজ। সেই দিনগুলোতে র্যাব-১-এর হলুদ দেয়ালের দিকে অনিশ্চিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ছেলের লাশ না পাওয়া মায়ের কাছে যান। বিধবা না সধবা—এটুকুও না জানা স্ত্রীর কাছে যান। এক ঘণ্টা বসে গল্প করুন। বুঝে যাবেন, জুলাই কী দিয়েছে।
পৃথিবীর সব বিপ্লবেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। বিপ্লব-পরবর্তী অস্থিরতা, অন্তর্কোন্দল—এসব নৈমিত্তিক বিষয়। অভ্যুত্থান ছিল সময়ের প্রয়োজনে ফ্যাসিবাদের শিকল ভাঙার এক অনিবার্য লড়াই।
আর অভ্যুত্থানের সফলতা-ব্যর্থতা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব আলাদা। সেই সময় এখনো আসেনি। কিন্তু সেই হিসাব দিয়ে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত লড়াইকে প্রশ্নবিদ্ধ করা সত্যিই দুঃখজনক।
সামগ্রিকভাবে নতুন রাষ্ট্রকল্পের যে কল্পনা, কাঠামোগত পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা—সেখানে পৌঁছাতে এখনো অনেক দেরি। নিঃসন্দেহে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকও হারিয়েছি। একই সঙ্গে সমাজকে পরিবর্তনের জন্য উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রেও আমরা ব্যর্থ হয়েছি।
পাশাপাশি এটাও সত্য, রাষ্ট্র-স্বীকৃত যে ফ্যাসিবাদ, রাষ্ট্র নিজের নাগরিকদের ওপর যে স্বপ্রণোদিত নিপীড়নের লাইসেন্স পেয়েছিল জবাবদিহিতা ছাড়াই, সেটি বন্ধ করে আমরা একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর দিকে এগোতে পেরেছি। নাগরিকের বাকস্বাধীনতা অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছে। কিছুটা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশ এখন নিজের অবস্থান নিতে পারছে। কয়েক বছর আগেও এটি কল্পনা করা কঠিন ছিল।
কিন্তু আমাদের কল্পনার রিপাবলিক পেতে, যে বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন আমরা দেখি, তার জন্য হয়তো আরও অনেক কাজ করতে হবে। যারা চলে গেছেন, তাঁরা সেই দায়িত্ব আমাদের ওপর দিয়েই গেছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং অর্থনৈতিক সুশাসনের জন্য আমাদের কাজ শুরু করতে হবে।
আমাদের প্রতিষ্ঠিত মূলধারার মিডিয়া এবং একটি establishment—সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাঠামো, নানা ধরনের সিস্টেমের মাধ্যমে আমাদের মানসিকভাবে হতাশ করতে চায়। আমাদের প্রত্যাশিত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এখনো হয়নি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও রাতারাতি বদলে যায়নি।
তাই বলে আমাদের অভ্যুত্থান মিথ্যা হয়ে যায় না। গণমানুষের এই জাগরণ বিতর্কিত হয় না।
৫ আগস্ট আনন্দমিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমে আসা প্রতিটি মানুষের উচ্ছ্বাসের মতোই জুলাই সত্য। শেষ সম্বল পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে মিষ্টি কিনে বিলিয়ে দেওয়া ছেলেটার আনন্দের মতোই জুলাই সত্য। জীবনে এত আনন্দ আর কোনো দিন আসেনি আমাদের জীবদ্দশায়।
এজন্যই আমাদের মিডিয়া কিংবা তথাকথিত সুশীল সমাজের নানা ধরনের প্রপাগান্ডার মধ্যেও জুলাই টিকে থাকবে।
বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি কল্যাণরাষ্ট্রের দিকে, তার সহনাগরিকদের আস্থার জনপদ হওয়ার দিকে এগিয়ে যাবে—ইনশাআল্লাহ। হয়তো সময় লাগবে, কিন্তু জুলাইয়ের চেতনাই পরবর্তী পথ দেখাবে।
যে জনতা নিজের জীবন তুচ্ছ করে ন্যায্যতার প্রশ্নে লড়াইয়ে নেমেছিল, সেই জনতা পরিবর্তনের প্রশ্নেও ছাড় দেবে না—এই আশা করি।
আমার ৩৬ জুলাই, আমাদের ৩৬ জুলাই একই রকম স্বমহিমায় ইতিহাসে টিকে থাকবে—ইনশাআল্লাহ।
Author