
সম্ভবত পুলক চ্যাটার্জির পরিবার ভাগ্যবান। তাঁর পরিবার স্বামীকে হারিয়ে শেষ পর্যন্ত টাকাটা পেয়েছেন।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়তো বর্তমান সময়ের সাংবাদিকদের কথা মাথায় রেখেই তাঁর ‘জীবিত ও মৃত’ ছোটগল্পে লিখেছিলেন—“কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই।”
সমকাল কর্তৃপক্ষ পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর চার দিনের মাথায় তাঁর পরিবারের হাতে ১০ লাখ টাকার চেক তুলে দিয়েছেন। বলতেই হবে—বাহ্! চমৎকার।
তবুও বলি, পুলক কিংবা তাঁর পরিবার হয়তো ভাগ্যবান। কিন্তু এই ভাগ্য কি বিভুর পরিবারের হয়েছে? আমার জানা মতে, না। তিনি হয়তো মরিয়াও প্রমাণ করতে পারেননি যে তিনি মরেছের।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, গত দুই দশকে একের পর এক পত্রিকা ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে, প্রকাশনা স্থগিত হয়েছে এবং শত শত সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন। ২০২০ সালেই একটি প্রতিবেদনে ২৫৪টি সংবাদপত্র বন্ধ হওয়ার তথ্য উঠে আসে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও অন্তত ১৫০ জন সম্প্রচার সাংবাদিক চাকরি হারানোর তথ্য পাওয়া যায়।
তবে গত ২০ বছরে মোট কতটি সংবাদপত্র বন্ধ হয়েছে এবং কতজন সাংবাদিক বেকার হয়েছেন—এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সমন্বিত ও নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান নেই। তবে বেকার সাংবাদিকের সংখ্যা হাজারের কম নয়।
তার থেকে বড় সমস্যা হলো, পেশায় কেউ একটু সিনিয়র হলেই তাঁকে বিভিন্নভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। এই পেশায় সরকারি সুযোগ-সুবিধা না থাকায় শেষ বয়সে এসে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একজন মাঠের সাংবাদিকও বেকার জীবনের শেষ সময় কাটান নানা ধরনের অর্থাভাব ও কষ্টের মধ্য দিয়ে।
ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের কথা কাগজে-কলমে বলা হলেও বাস্তবতা সংবাদমাধ্যমগুলোর অফিসে একেবারেই ভিন্ন।
একজন সিনিয়র সাংবাদিকের কথা বলতেই হয়। তিনি সারাজীবন মাথা উঁচু করে দেশ ও জাতির জন্য লিখেছেন। গত সন্ধ্যায় দেখলাম, প্রেসক্লাবের লবিতে বসে বসে ঝিমাচ্ছেন। কারণ হয়তো এই পেশার সঙ্গে জড়িতদের কাছে অজানা নয়।
আমি গত বছর কাজ করতাম একটি অনলাইন পত্রিকায়। হঠাৎ করে তিন মাসের বেতন বকেয়া পড়ল। আমাদের সঙ্গে কাজ করা এক তরুণ সংবাদকর্মীর স্ত্রীর মিসক্যারেজ হলো। তাঁর পকেটে কোনো টাকা নেই, স্ত্রীকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। সেদিন তাঁর ভেজা চোখ আমাদের এখনো কষ্ট দেয়।
জানি না, সংবাদপত্রের মালিক কর্তৃপক্ষ হয়তো সাংবাদিকদের এই অজানা কথাগুলো বোঝেন না। তাঁরা দেখেন প্রধানমন্ত্রী কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার মুহূর্তটি। কিন্তু সেই সাংবাদিকের যে পরিবার-পরিজন আছে, তাঁদের খাবার, চিকিৎসা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় বহন করতে হয়—তা হয়তো তাঁদের ধারণার বাইরে।
গত বছর বিভুরঞ্জন সরকার মারা যাওয়ার পর তাঁর সুইসাইডাল নোটে নিজের ও ছেলের অসুস্থতা, মেডিক্যাল পাস সরকারি কর্মকর্তা মেয়ের উচ্চতর পরীক্ষায় ‘ফেল করা’, বুয়েট থেকে পাস করা ছেলের ‘চাকরি না হওয়া’ এবং নিজের আর্থিক দৈন্য নিয়ে হতাশার কথা লিখেছিলেন।
বিভুরঞ্জন সরকারের সর্বশেষ খোলা চিঠিটি পড়লে আপনি বুঝবেন, কীভাবে এই রাষ্ট্র, সমাজ এবং মানুষেরা একজন সৎ ও শ্রেষ্ঠ সাংবাদিককে হত্যা করে। কীভাবে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের মরদেহ ভেসে ওঠে।
চার দিন আগে, দৈনিক সমকালের বরিশালের সাবেক ব্যুরোপ্রধান পুলক চ্যাটার্জি চারটি চিঠি লিখে তাঁর অফিসের ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে পড়েন।
হয়তো এই শেষ অন্তিম মুহূর্তের আগে তিনি অনেক কান্না করেছিলেন। হয়তো সমকাল থেকে তাঁর পাওনা অর্থের জন্য সর্বশেষ চেষ্টাটুকুও করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের মুখের কথা চিন্তা করে কিছুক্ষণ বসেও ছিলেন।
শেষ নিঃশ্বাসটা তাঁর সেখানেই ছিল, যেখানে দীর্ঘ সময় বসে তিনি মানুষের কথা লিখেছেন। লিখেছেন চাকরি হারিয়ে উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়া শ্রমিকের আত্মনাদের কাহিনি।
মৃত্যুর আগে লেখা চিঠিতে তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী সুমন চৌধুরীকে অনুরোধ করেছিলেন, সমকালের কাছে তাঁর কোনো বকেয়া পাওনা আদায় করে তাঁর স্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
২০২৩ সালের মে মাসে সমকাল থেকে চাকরি হারান পুলক। দীর্ঘ ১৩ বছর কাজ করার পর চাকরিচ্যুত হলেও তিনি প্রায়ই সমকাল কার্যালয়ে যেতেন।
প্রশাসনের উদ্দেশে লেখা পৃথক একটি চিঠিতে পুলক লিখেছিলেন, বিভিন্ন ভাবে সাহায্য চেয়েছেন। সাহায্য চাওয়ার মধ্য দিয়েই একজন পেশাদার সাংবাদিকের জীবনের ইতি ঘটল। তাঁর রেখে যাওয়া চিঠিগুলো এক যন্ত্রণাবিদ্ধ মনের কথা বলে—যেখানে নিজের পরিবারের দেখাশোনার জন্য তিনি পেশার কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন।
প্রশ্নটি কেবল পুলকের ক্ষেত্রে কী ঘটেছে, তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, কর্মজীবনজুড়ে সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? এবং সেই সুরক্ষা যখন ব্যর্থ হয়, তখন কী ঘটে?
সংবাদপত্রের কর্মীদের মজুরির জন্য ওয়েজবোর্ডের কাঠামো রয়েছে। শ্রম আইনে কর্মসংস্থান ও চাকরিচ্যুতি নিয়ে সুরক্ষার বিধান রয়েছে। এছাড়া অসুস্থতা, আঘাত ও আর্থিক সংকটে পড়া সাংবাদিকদের সহায়তায় সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট রয়েছে।
তবুও ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন নিয়ে চলমান বিরোধ দেখায়—কাগজে থাকা অধিকারের সঙ্গে বাস্তব আর্থিক নিরাপত্তার বড় ফারাক রয়েছে। এই ব্যবধান সাংবাদিকদের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করে।
সাংবাদিকরা প্রায়ই শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে প্রতিবেদন করেন। অথচ নিজেদের মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়েই তাঁরা অনিশ্চয়তায় থাকেন।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বিএসএস) এবং আর মাত্র তিন-চারটি পত্রিকা ছাড়া বাংলাদেশের অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো কোনোভাবেই ওয়েজবোর্ড অনুসরণ করে না।
বাংলাদেশের কাগজে-কলমে ওয়েজবোর্ডের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সরকার নবম ওয়েজবোর্ড রোয়েদাদের গেজেট প্রকাশ করে। তবে গেজেট প্রকাশের এক বছরেরও বেশি সময় পর, ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর হাইকোর্ট সাংবাদিকদের আয়কর ও গ্র্যাচুইটি-সংক্রান্ত দুটি বিধানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এর আগে ২০১৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের বেতন ৭৫ শতাংশ বাড়িয়ে অষ্টম ওয়েজবোর্ডের গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল। ২০ দিন পর তৎকালীন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়।
২০১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) জানায়, নবম ওয়েজবোর্ডের নতুন বেতন স্কেল ও সুপারিশ অবাস্তব এবং অগ্রহণযোগ্য। কারণ দেশের কোনো সংবাদপত্রেরই তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই।
নোয়াব জানায়, ২০০৮ সালের সপ্তম ওয়েজবোর্ডে মূল বেতন ৮৯ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০১৩ সালের অষ্টম ওয়েজবোর্ডে ৭৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। হাতে গোনা কয়েকটি পত্রিকা ছাড়া বেশিরভাগ সংবাদপত্রের পক্ষেই অষ্টম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে নবম ওয়েজবোর্ড কমিটি ৮৫ শতাংশ বেতন বাড়ানোর যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা নোয়াবের মতে বাস্তবসম্মত নয়।
বাস্তবে স্থায়ী সাংবাদিকেরা এখনো ১৩ বছর আগে প্রকাশিত অষ্টম ওয়েজবোর্ডের আওতায় রয়েছেন। এই ঘাটতি সাংবাদিকদের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করে।
সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে লেখেন, অথচ নিজেদের বেতন, চাকরির নিশ্চয়তা ও প্রাপ্য সুবিধার প্রশ্নে নিজেরাই ঘোর অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন।
পুলক চ্যাটার্জির পরিবার ১০ লাখ টাকা পেয়েছে। হয়তো তাঁর পাওনা কিছুটা মিটেছে। কিন্তু যে প্রশ্নটি থেকে গেল, তার উত্তর কে দেবে? একজন সাংবাদিককে তাঁর প্রাপ্য টাকা পেতে কেন মৃত্যুর পথ বেছে নিতে হবে?
একজন সাংবাদিকের জীবনের মূল্য কি তাঁর মৃত্যুর পর দেওয়া ১০ লাখ টাকার চেক?
আর বিভুরঞ্জন সরকার? আর সেই অসংখ্য সাংবাদিক, যাঁরা চাকরি হারিয়ে, বেতন না পেয়ে, অসুস্থ হয়ে কিংবা বয়সের ভারে আজ নীরবে দিন কাটাচ্ছেন?
পুলক কি শেষ সাংবাদিক? নাকি আমাদের আরও কোনো পুলকের মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকতে হবে—যাতে তাঁর পরিবারের হাতে একটি চেক তুলে দিয়ে আমরা আবার বলি, ‘বাহ্! চমৎকার’?
Author