
মক্কায় ড্রোন ভূপাতিত করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আলোচনায় ‘সেন্টকম’।
এই সেন্টকম ২০২১ সাল থেকেই মার্কিন প্রতিরক্ষা সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইসরায়েলকে CENTCOM-এর ‘এরিয়া অব রেসপনসিবিলিটি’ (AOR) বা দায়িত্বপ্রাপ্ত অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যা এক কথায় ইসরায়েল-সম্পর্কিত মার্কিন সামরিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
হুতিদের জোরালো দাবি, তারা মক্কায় কোনো ড্রোন উড়ায়নি। অথচ সৌদি দাবি করছে, এটি হুতিদের ড্রোন। এর মধ্যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিভিন্ন মহল থেকে নিরাপত্তার জন্য CENTCOM-এর কথা সামনে চলে এলো। এরপর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসছে—এই ড্রোন হামলার পেছনে আসলে কী আছে?
মক্কা এবং মদিনায় কোনো ইসরায়েলি ও অন্য ধর্মের মানুষ প্রবেশ করতে পারে না। কিন্তু এই সুযোগে ইসরায়েলিরা সেখানে প্রবেশের পথ খুঁজছে কি না, তা নিয়ে মুসলিম বিশ্বে এখন আলোচনা তুঙ্গে।
তাও আবার মক্কা চুক্তির কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। তাই সন্দেহটা আরও জোরালো হচ্ছে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। চুক্তিটি তিন দেশের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও যৌথ প্রতিরোধক্ষমতা জোরদারের কথা বলেছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সৌদি আরব এমন এক নিরাপত্তা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, যা এই নতুন জোটের বাস্তব সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি করেছে।
ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হওয়ার মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, মক্কার দক্ষিণে একটি হুতি ড্রোন মক্কার নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগে ধ্বংস করা হয়েছে। হুতিরা অবশ্য মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে, সৌদি আরব হুতিদের মোকাবিলায় ইসরায়েলের কাছ থেকে গোয়েন্দা সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের CENTCOM-এর মাধ্যমে যোগাযোগ করেছে। এসব প্রতিবেদনে ইসরায়েলি ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত বিষয়টি সৌদি বা ইসরায়েল সরকারের প্রকাশ্য আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে সামনে আসেনি। ফলে এটিকে নিশ্চিত দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা হিসেবে নয়, বরং প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসা একটি সম্ভাব্য গোয়েন্দা সমন্বয় হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
এখানেই মক্কা চুক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তব নিরাপত্তা রাজনীতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সামনে আসে।
কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তিতে ‘এক দেশের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা’—এমন ভাষা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী বার্তা দেয়। কিন্তু এর বাস্তব অর্থ নির্ভর করে চুক্তির প্রয়োগ-পদ্ধতি, সামরিক সক্ষমতা, গোয়েন্দা অবকাঠামো, কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
মক্কা চুক্তি এসব দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করেছে। কিন্তু চুক্তির প্রতিটি পরিস্থিতিতে কী ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া হবে, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হয়েছে—এমনটি বলা যায় না। পাকিস্তান ১০ সেপ্টেম্বর স্পষ্ট করেছে যে সৌদির ওপর সাম্প্রতিক হুতি হামলার পর মক্কা চুক্তির আওতায় কোনো তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়নি। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ চুক্তির প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
অর্থাৎ, প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকা এবং নির্দিষ্ট সংকটে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ—দুটি বিষয় এক নয়।
সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ফলে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সক্ষমতার সঙ্গে সৌদি নিরাপত্তা ব্যবস্থার সম্ভাব্য যোগাযোগের খবরটি মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত রাজনৈতিক সমীকরণের দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে এখানে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে নিরাপত্তা বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে দেখার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের রাজনৈতিক সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা থাকলেও উভয় দেশের জন্য ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের কর্মকাণ্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট হুমকির ক্ষেত্রে পরোক্ষ বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তথ্য বিনিময়ের সম্ভাবনা তৈরি হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। CENTCOM দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমন্বয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সৌদি ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্ভাব্য গোয়েন্দা যোগাযোগে CENTCOM-এর মধ্যস্থতার কথা বলা হয়েছে।
মক্কা চুক্তিকে শুধু একটি ধর্মীয় ঐক্যের প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর কৌশলগত দিকটি আড়ালে পড়ে যেতে পারে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক—তিন দেশই মুসলিম-অধ্যুষিত রাষ্ট্র, কিন্তু তাদের জাতীয় নিরাপত্তা অগ্রাধিকার, ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক সক্ষমতা এবং বৈদেশিক নীতি এক নয়।
সৌদি আরবের প্রধান উদ্বেগের একটি হলো তার ভূখণ্ড, জ্বালানি অবকাঠামো এবং লোহিত সাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক নিরাপত্তা। অন্যদিকে পাকিস্তানের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার দক্ষিণ এশিয়াকেন্দ্রিক, আর তুরস্কের কৌশলগত স্বার্থ বিস্তৃত ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে।
ফলে একটি অভিন্ন ধর্মীয় পরিচয় তিন দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে পারে, কিন্তু সব নিরাপত্তা সংকটে অভিন্ন সামরিক প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করে না।
বর্তমান সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভৌগোলিক বাস্তবতা। হুতিদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব লোহিত সাগর এবং বাব আল-মান্দাব অঞ্চলে বাড়তে থাকায় শুধু সৌদি আরব নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাব আল-মান্দাবের কৌশলগত গুরুত্ব এবং সৌদি তেল পরিবহনের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে।
এ কারণে সৌদির নিরাপত্তা হিসাব এখন শুধু ইয়েমেনের সীমান্ত বা ড্রোন প্রতিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তেল রপ্তানি, সমুদ্রপথ, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি।
সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে মক্কা চুক্তিকে ব্যর্থ ঘোষণা করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো নেই। কারণ চুক্তিটি সদ্য স্বাক্ষরিত এবং এর পূর্ণাঙ্গ সামরিক কাঠামো ও বাস্তব প্রয়োগের দীর্ঘমেয়াদি চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে বর্তমান সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। চুক্তির রাজনৈতিক ঘোষণাকে কত দ্রুত বাস্তব গোয়েন্দা সহযোগিতা, আকাশ প্রতিরক্ষা, সামরিক সমন্বয় এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতায় রূপ দেওয়া যায়—তার ওপর এর ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে।
আর সৌদি আরবের সম্ভাব্য ইসরায়েলি গোয়েন্দা সহযোগিতা যদি সত্যিই বাস্তব রূপ নেয়, তাহলে সেটি আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করবে: মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো এখন শুধু ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে না; বরং হুমকির ধরন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, গোয়েন্দা তথ্য এবং তাৎক্ষণিক জাতীয় স্বার্থ ক্রমেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মক্কা চুক্তি একটি রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কাঠামো। ইসরায়েলের সম্ভাব্য গোয়েন্দা সহায়তা একটি আলাদা নিরাপত্তা বাস্তবতা। দুটিকে পরস্পরের সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
বরং বর্তমান ঘটনাপ্রবাহের বড় শিক্ষা হলো—আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রগুলো একই সঙ্গে একাধিক নিরাপত্তা অংশীদারের ওপর নির্ভর করতে পারে। কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব থাকলেও নির্দিষ্ট নিরাপত্তা স্বার্থে তার সক্ষমতা ব্যবহার করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনছে: ভবিষ্যতের নিরাপত্তা জোটগুলো কি প্রধানত অভিন্ন পরিচয়ের ওপর দাঁড়াবে, নাকি বাস্তব হুমকি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ভিত্তিতে নতুন ধরনের বহুস্তরীয় সহযোগিতা তৈরি হবে?
সৌদি আরবের বর্তমান নিরাপত্তা সংকট সেই প্রশ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
Author