
পবিত্র নগরী মক্কার দক্ষিণে একটি হুথি ড্রোন ধ্বংস করার দাবি করেছে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। তবে মক্কাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে হুথি গোষ্ঠী।
জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে বলেন, মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় মক্কার আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ড্রোনটি ধ্বংস করা হয়।
আল-মালিকির দাবি, ২০১৭ সালের জুলাইয়ে মক্কা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর এটি পবিত্র নগরীটিকে লক্ষ্য করে হুথিদের দ্বিতীয় হামলার চেষ্টা।
তবে হুথিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ ইয়েমেন থেকে মক্কা লক্ষ্য করে ড্রোন পাঠানোর অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং এর কোনো সত্যতা নেই’ বলে দাবি করেছেন। হুথি নিয়ন্ত্রিত সংবাদ সংস্থা সাবা-তে প্রকাশিত মন্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
আল-ফারাহ বলেন, ‘যারা রাজনৈতিক স্বার্থে মক্কা ও পবিত্র স্থানগুলোকে ব্যবহার করে, তাদের চেয়ে আমরা মক্কা ও পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।’
সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ইয়েমেনে দেশটি যে সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, সেখান থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতেই মক্কা নিয়ে এমন অভিযোগ করা হয়েছে।
আল-ফারাহর দাবি, ইয়েমেনে যুদ্ধ, অবরোধ ও দখলদারত্বে জড়িয়ে পড়ার পর সৌদি আরব ‘বাস্তব এক সংকটের’ মুখোমুখি হয়েছে এবং এসব পদক্ষেপের পরও তাদের লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
তিনি বলেন, সৌদি আরব এখন ‘সমস্যার মূল কারণ থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে এবং মুসলিমদের মধ্যে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উসকে দিতে চাইছে’।
যুদ্ধ বন্ধ, অবরোধ প্রত্যাহার এবং বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্য ইয়েমেনিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান জানান আল-ফারাহ।
তিনি বলেন, ‘সমাধান পরিষ্কার—আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে, অবরোধ তুলে নিতে হবে, ইয়েমেনকে তার নিজের মতো থাকতে দিতে হবে এবং বছরের পর বছর যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্য ইয়েমেনিদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কেবল তখনই সৌদি আরব নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য কাজ করতে পারে।’
চলমান সংঘাত আরও বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন আল-ফারাহ। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি সংঘাতের দরজা খুলবে, তাকে এর পরিণতি বহন করতে হবে।’
তার ভাষ্য, সংঘাত অব্যাহত রাখা সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও তেল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে ‘জুয়া খেলার শামিল’।
পশ্চিম এশিয়াজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ইরান-সমর্থিত হুথিদের ধারাবাহিক হামলার পর দেশটির সামরিক সম্পৃক্ততাও বেড়েছে।
মঙ্গলবার মক্কা নিয়ে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করে সৌদি আরব। গত এক সপ্তাহে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় বেশ কয়েকটি বড় হামলার ঘোষণা দিয়েছে হুথিরা। সোমবার একটি বিমানঘাঁটিতে হামলার দাবিও করে তারা। হুথিদের দাবি, ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান হামলার জবাব হিসেবে এসব হামলা চালানো হয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমানঘাঁটিতে হামলায় ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন।
এর আগে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন ব্যবস্থা ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার জন্য ইরানপন্থী একটি ইরাকি গোষ্ঠীকে দায়ী করে রিয়াদ।
প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন সৌদি আরবের উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলোকে লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। হরমুজ প্রণালিতে প্রায় সাত মাস ধরে চলমান যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় পাইপলাইনটি সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রপ্তানি পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
শুক্রবারের হামলার পর পাইপলাইনটি বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসায়ী ও জ্বালানি বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ সময় পাইপলাইনটি বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ ব্যাহত হতে পারে।
সৌদি আরব এখনো জানায়নি, পাইপলাইনে তেল পরিবহন কবে নাগাদ পুনরায় শুরু হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট মঙ্গলবার বলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই পাইপলাইন দিয়ে আবার অপরিশোধিত তেল পরিবহন শুরু হতে পারে।
২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে সৌদি আরব। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধবিরতির কারণে সংঘাত অনেকটাই স্তিমিত ছিল। তবে চলতি মাসে ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনীর বিরুদ্ধে হুথিদের নতুন করে অভিযান শুরুর পর পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
হুথিদের সাম্প্রতিক হামলার পর গত সপ্তাহে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং সামরিক সহায়তা চান। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা মূলত গোয়েন্দা তথ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
Author