
“একজন পুরুষ কখনোই একজন ভালো নারীর সমর্থন ছাড়া সফল হতে পারেন না”—বলেছিলেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ম্যাকমিলান। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর জীবন যেন এই উক্তিরই বাস্তব প্রতিফলন। তবে এই বক্তব্যে আমি একটি সংশোধন করতে চাই—জিন্নাহর পাশে থাকা নারীরা তাঁর পেছনে ছিলেন না; বরং তাঁরা তাঁর পাশে হেঁটেছেন এবং তাঁকে শক্তি জুগিয়েছেন।
জিন্নাহর জীবনে বেশ কয়েকজন নারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে সাতজন তাঁর জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিলেন। দুঃখজনক বিষয় হলো, তাঁদের সম্পর্কে খুব সামান্য তথ্যই পাওয়া যায়। তাও আবার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তথ্যের টুকরো-টাকরা।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জিন্নাহর জীবনে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি তাঁর মা মিথিবাই সম্পর্কে আমরা প্রায় কিছুই জানি না। এমনকি হেক্টর বোলিথো তাঁর Jinnah: Creator of Pakistan (1954) জীবনীতে তাঁকে বর্ণনা করতে গিয়ে লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন—জিন্নাহর জীবনের কাহিনিতে তিনি “কখনোই একটি অস্পষ্ট ছায়ার বেশি হয়ে উঠতে পারেননি।”
জিন্নাহর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ নারীদের একটি তালিকা তৈরির চেষ্টা করেছি। এখানে তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় জিন্নাহকে নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
মিথিবাই ভারতের পশ্চিম উপকূলের কাঠিয়াওয়ার অঞ্চলের ধাফা গ্রামের একটি সম্মানিত ইসমাইলি খোজা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৭৪ সালে পারিবারিকভাবে নির্ধারিত বিয়ের মাধ্যমে তিনি জিন্নাভাইয়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জিন্নাভাই তখন সংগ্রামরত একজন ব্যবসায়ী। কাছের শহর গোন্ডালে তাঁদের বিয়ে হয়।
স্বামী তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন এবং “তাঁর তরুণ স্ত্রীর প্রতি সমস্ত মনোযোগ ও যত্ন ঢেলে দিতেন”—জিন্নাহর ছোট বোন ফাতিমা জিন্নাহ তাঁর ১৯৮৭ সালের বই My Brother-এ এমনটাই লিখেছেন। স্বামীর ওপর মিথিবাইয়ের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। ফাতিমার ভাষায়, তাঁর তরুণ স্ত্রীর অনুরোধের উষ্ণতায় স্বামীর মাঝে মাঝে দেখা দেওয়া “একগুঁয়েমিও গলে যেত।”
জিন্নাভাইয়ের সঙ্গে মিথিবাইয়ের ভালোবাসা ও প্রভাবের বন্ধন স্পষ্ট হয় তাঁদের বিয়ের এক বছরের মধ্যেই। ভালো ভবিষ্যতের আশায় জিন্নাভাই যখন করাচিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, মিথিবাইও তাঁর সঙ্গে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় সাধারণত পুরুষেরা একাই নতুন জায়গায় যেতেন এবং সেখানে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার পর স্ত্রী ও পরিবারকে নিয়ে যেতেন।
করাচিতে তাঁদের জীবন শুরু হয়েছিল কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। তাঁরা একটি সাধারণ দুই কক্ষের বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন। হেক্টর বোলিথোর বর্ণনায়, “মরুভূমির ধুলা গরম মেঘের মতো তাঁদের ওপর নেমে আসত; তা তাঁদের খাবার, কাপড় এবং ফুসফুসেও ঢুকে পড়ত।”
“একদিকে ছিল পানির জন্য আকুল শুকনো মাটি; অন্যদিকে পশ্চিমে ছিল সমুদ্র, যেখান থেকে তাঁরা জীবিকা নির্বাহ করতেন।”
কিন্তু সব প্রতিকূলতার মধ্যেও মিথিবাই সাহস ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দেন।
এই কঠিন পরিবেশেই তিনি তাঁর প্রথম সন্তান মোহাম্মদ আলীর জন্ম দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। ফাতিমা জিন্নাহ লিখেছেন, “আমার মা মোহাম্মদ আলীকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তাঁর আরও ছয়টি সন্তান জন্ম নেওয়ার পরও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মোহাম্মদ আলী তাঁর প্রিয় সন্তান ছিলেন।”
মা তাঁর ছোট ছেলের মনে বড় হওয়ার স্বপ্ন তৈরি করেছিলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, একদিন তাঁর ছেলে বড় কিছু করবেন।
ফাতিমা জিন্নাহ তাঁর মায়ের কথা উদ্ধৃত করে লিখেছেন, “আমার মোহাম্মদ আলী একদিন বড় মানুষ হবে; সে খুব বুদ্ধিমান হবে; অন্য ছেলেদের চেয়েও ভালো হবে।”
এটি শুধু আশাবাদ ছিল না; এর সঙ্গে ছিল বাস্তব নির্দেশনাও। মিথিবাই তরুণ জিন্নাহকে নিয়মিত স্কুলে যেতে এবং পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে বলতেন। ফাতিমার ভাষায়, তিনি বলতেন—এভাবেই জীবনে উন্নতি করতে হবে এবং অন্যদের চেয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে।
১৬ বছর বয়সে জিন্নাহ যখন পড়াশোনার জন্য লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা করেন, তখন প্রিয় সন্তানকে বিদায় দেওয়া মিথিবাইয়ের জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। কিন্তু ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি তাঁকে যেতে দেন।
ফাতিমা জিন্নাহর ভাষ্য অনুযায়ী, বিদায়ের সময় মিথিবাই বলেছিলেন: “আমার ছেলে, তোমার কাছ থেকে দূরে থাকতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত, ইংল্যান্ডে যাওয়া তোমাকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হতে সাহায্য করবে। সারা জীবন এটাই আমার স্বপ্ন ছিল... মোহাম্মদ আলী, তুমি এখন দীর্ঘ যাত্রায় বের হচ্ছ। আমার মনে হচ্ছে, ইংল্যান্ড থেকে তোমার ফিরে আসা আমি দেখে যেতে পারব না। আল্লাহ তোমার রক্ষাকর্তা হবেন। তিনি আমার ইচ্ছা পূরণ করবেন। তুমি একজন বড় মানুষ হবে। আর আমি তোমাকে নিয়ে গর্বিত হব।”
মিথিবাইয়ের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়েছিল। জিন্নাহ লন্ডনে পড়াশোনা করার সময়ই তাঁর মা মারা যান।
মায়ের মৃত্যুসংবাদ শুনে জিন্নাহ ভেঙে পড়েছিলেন। ফাতিমা জিন্নাহ লিখেছেন, “পৃথিবীতে যাঁকে তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, সেই মায়ের মৃত্যুর সংবাদে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঁদেন ও হাহাকার করেন।”
“বাড়ি থেকে বহু দূরে, একাকী অবস্থায় এবং মায়ের শেষ দিনগুলোতে তাঁর পাশে থাকতে না পারার শোক তাঁকে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করেছিল। তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন,” লিখেছেন ফাতিমা।
তবে জিন্নাহ তাঁর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন। মায়ের যে স্বপ্ন ছিল—ছেলে বড় মানুষ হবে—সেটি পূরণ করার প্রচেষ্টায় তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেন।
এই অসাধারণ নারীকে করাচিতে সমাহিত করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাঁর কবরের অবস্থান এখনো কেউ নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করতে পারেনি। ফলে জনগণও সেই নারীকে যথাযথ শ্রদ্ধা জানাতে পারেনি, যিনি এমন এক মহান সন্তানকে জন্ম দিয়েছিলেন।

জিন্নাভাইয়ের একমাত্র ছোট বোন মানবাই জিন্নাহকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। তিনি সফল ব্যবসায়ী পীরভাইকে বিয়ে করেছিলেন এবং বোম্বেতে বসবাস করতেন।
ফাতিমা জিন্নাহ তাঁর এই পিসির কথা স্মরণ করে লিখেছেন, “তিনি ছিলেন অসাধারণ গল্পকথক। তিনি ছিলেন আমাদের চোখ ও কানের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতি রাতে তাঁর মুগ্ধকর গল্প বলার ধরনে আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতাম—পরীদের গল্প, উড়ন্ত গালিচার গল্প, জিন ও ড্রাগনের গল্প; শিশুমনে সেগুলো ছিল অসাধারণ, যেন অন্য কোনো জগতের গল্প।”
মানবাইয়ের সঙ্গে জিন্নাহর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। প্রায় ১১ বছর বয়সে, ১৮৮৭ সালে, তিনি করাচিতে নিজের বাড়ি ও স্কুল ছেড়ে বোম্বেতে পিসির সঙ্গে থাকতে যান।
খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ ও ভারততত্ত্ববিদ স্ট্যানলি উলপার্ট তাঁর Jinnah of Pakistan বইয়ে লিখেছেন, জিন্নাহ তাঁর পিসি মানবাইকে অনুসরণ করেছিলেন। সম্ভবত সেই সময়ের প্রেসিডেন্সি রাজধানী বোম্বের সৌন্দর্য, আভিজাত্য ও অসীম আকর্ষণের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন মানবাই।
মানবাই তাঁকে স্থানীয় একটি স্কুলে ভর্তি করান এবং বোম্বের জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এই শহরের সঙ্গে জিন্নাহর সম্পর্ক পরবর্তী জীবনেও গভীর ছিল। পরবর্তীকালে তিনি এই শহরেই বসবাস ও আইন পেশা করার সিদ্ধান্ত নেন।
পিসি ও ভাগ্নের এই বন্ধন তাঁদের সারা জীবন অটুট ছিল।
১৮৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ১৫ বছর বয়সে জিন্নাহ এমিবাইকে বিয়ে করেন।
বিয়ের দিন জিন্নাহ “মাথা থেকে পা পর্যন্ত অদৃশ্য সাদা সুতায় গাঁথা ফুলের মালায় ঢাকা” অবস্থায় এমিবাইয়ের বাড়ির দিকে বরযাত্রী নিয়ে এগিয়ে যান। ফাতিমা জিন্নাহ লিখেছেন, ১৪ বছর বয়সী এমিবাই তখন “দামি নতুন পোশাক পরা, ভারী গয়নায় সজ্জিত, হাতে মেহেদি এবং মুখ ও পোশাকে সুগন্ধি ছড়ানো অবস্থায়” বরযাত্রার অপেক্ষায় ছিলেন।
এই দাম্পত্য প্রায় এক বছর স্থায়ী হয়। এরপর জিন্নাহ ইংল্যান্ডে চলে যান।
গ্রামের মেয়ে এমিবাই ছিলেন লাজুক এবং নিকটাত্মীয় পুরুষদের সামনেও পর্দা করতেন। ফাতিমা জিন্নাহ লিখেছেন, পারিবারিক রীতি অনুযায়ী শ্বশুরের সামনে এলেই এমিবাই ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে রাখতেন। কিন্তু মোহাম্মদ আলীর এ বিষয়ে নিজস্ব মত ছিল।
তিনি মনে করতেন, তাঁর স্ত্রী তাঁর বাবা-মায়ের কাছে মেয়ের মতো এবং পরিবারের একজন পূর্ণ সদস্য। শুধু পূর্বপুরুষেরা এমনটি করে এসেছেন বলে তাঁকে মুখ ঢেকে রাখতে হবে—এমন কোনো প্রয়োজন নেই।
ফাতিমার ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিনের পর এমিবাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সেই পুরোনো রীতি ত্যাগ করেন।
জিন্নাহর প্রথম স্ত্রী সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। জানা যায়, জিন্নাহ ইংল্যান্ডে যাওয়ার কিছুদিন পরই এমিবাই মারা যান। তাঁর মৃত্যুসংবাদ জিন্নাহকে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করে।
এরপর পরবর্তী প্রায় ২৫ বছর—ইংল্যান্ড কিংবা ভারত, কোথাও—জিন্নাহ আর কোনো নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়াননি। ২৫ বছর পর তাঁর জীবনে আসেন রতনবাই।

অত্যন্ত পরিশীলিত ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অগ্রসর ১৮ বছর বয়সী রতনবাই—যিনি ‘রুটি’ নামে পরিচিত ছিলেন—১৯১৮ সালের এপ্রিলে ৪২ বছর বয়সী জিন্নাহকে বিয়ে করেন। বয়স ও ধর্মের পার্থক্য অতিক্রম করেই তাঁদের এই বিয়ে হয়।
১৯১৮ সালের ১৯ এপ্রিল কলকাতার Daily Statesman-এ প্রকাশিত ঘোষণায় বলা হয়েছিল, “স্যার দিনশাহ পেটিটের একমাত্র কন্যা মিস রতনবাই গতকাল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন এবং আজ মাননীয় এম. এ. জিন্নাহকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন।”
পরের বছর তাঁদের একমাত্র সন্তান দিনার জন্ম হয়।
জিন্নাহ তাঁর জীবনের অন্য যেকোনো নারীর তুলনায় রতনবাইকে বেশি ভালোবাসতেন। সাহিত্য ও চারুকলার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। লেখক শরীফ আল মুজাহিদ তাঁর Jinnah: A Portrait প্রবন্ধে লিখেছেন, রতনবাই “জিন্নাহর সামনে রুচির এক নতুন জগৎ খুলে দিয়েছিলেন।”
পরবর্তী সময়ে তাঁদের দাম্পত্য জীবনে নানা সমস্যা দেখা দিলেও ভালোবাসার সম্পর্ক পুরোপুরি নিভে যায়নি। মূল সমস্যা ছিল জীবন সম্পর্কে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য।
জিন্নাহ ছিলেন লক্ষ্যনির্ভর মানুষ। জীবনের রাজনৈতিক ও সামাজিক লক্ষ্যকে তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে চাইতেন। অন্যদিকে রতনবাই চেয়েছিলেন রূপকথার মতো রোমান্টিক জীবনযাপন করতে।
বোলিথো তাঁদের পার্থক্যকে সংক্ষেপে এভাবে তুলে ধরেছেন: “জিন্নাহর কাছে বিবাহিত জীবন ছিল একটি গুরুগম্ভীর দায়িত্ব; তাঁর তরুণ স্ত্রীর কাছে এটি ছিল আনন্দেরও একটি সুযোগ।”
এই পার্থক্য তাঁদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে, যদিও তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি।
১৯২৮ সালের অক্টোবরে, মৃত্যুর কয়েক মাস আগে, রতনবাই জিন্নাহকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিটি রোমান্টিক সাহিত্যের একটি আবেগঘন দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
তিনি লিখেছিলেন:
“প্রিয়তম, তুমি যা কিছু করেছ তার জন্য ধন্যবাদ। আমাকে মনে রাখার চেষ্টা করো—তুমি যে ফুলটি তুলে নিয়েছিলে হিসেবে, যে ফুলের ওপর পা দিয়েছিলে হিসেবে নয়... আমি তোমাকে এমনভাবে ভালোবেসেছি, যেমনভাবে খুব কম পুরুষই ভালোবাসা পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে। আমি শুধু তোমার কাছে অনুরোধ করি, যে ট্র্যাজেডির শুরু হয়েছিল ভালোবাসা দিয়ে, তার সমাপ্তিও যেন ভালোবাসায় হয়। প্রিয়তম, শুভরাত্রি ও বিদায়।”
পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে, নিজের ২৯তম জন্মদিনে রতনবাই মারা যান।
জিন্নাহ তাঁকে কতটা ভালোবাসতেন, তা বোঝা যায় তাঁর মৃত্যুর পরের একটি ঘটনা থেকে। যখন তাঁর মরদেহ কবরে নামানো হচ্ছিল, জিন্নাহ নিজেকে আর সামলাতে পারেননি। প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে আল-মুজাহিদ লিখেছেন, তিনি শিশুর মতো ভেঙে পড়ে কেঁদেছিলেন।
রতনবাইয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসার আরেকটি প্রমাণ হলো—তাঁর মৃত্যুর পর জীবনের বাকি সময়ে জিন্নাহ আর কোনো নারীকে বিয়ে করেননি।
জিন্নাহ তাঁর বোন ফাতিমা জিন্নাহর কাছে অনেকটা ভাইয়ের চেয়ে বাবার মতো ছিলেন। ১৮৯৩ সালের জুলাইয়ে জন্ম নেওয়া ফাতিমা তাঁর ভাইয়ের চেয়ে প্রায় ১৭ বছরের ছোট ছিলেন।
ফাতিমার জন্মের সময় জিন্নাহ লন্ডনে পড়াশোনা করছিলেন। দেশে ফিরে তিনি পরিবারের সদস্যদের বোম্বেতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।
১৯০১ সালে তাঁদের বাবা মারা যাওয়ার সময় ফাতিমার বয়স ছিল মাত্র আট বছর। তখন জিন্নাহ তাঁর অভিভাবকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তিনি ফাতিমার শিক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। ১৯০২ সালে তাঁকে বোম্বের মর্যাদাপূর্ণ বান্দ্রা কনভেন্টে ভর্তি করেন। পরে তিনি সেন্ট প্যাট্রিক স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং ১৯১৩ সালে সিনিয়র কেমব্রিজ সম্পন্ন করেন।
ফাতিমা পরিবারের বাড়ি ছেড়ে জিন্নাহর বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে বসবাস করেন। রতনবাইকে বিয়ের আগ পর্যন্ত প্রায় আট বছর তিনি ভাইয়ের সঙ্গে ছিলেন।
এরপর জিন্নাহ তাঁকে কলকাতার ড. আহমেদ ডেন্টাল কলেজে ভর্তি করেন। পড়াশোনা শেষ করার পর জিন্নাহ তাঁকে মুম্বাইয়ে একটি ডেন্টাল ক্লিনিক প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন।
১৯২৯ সালে রতনবাইয়ের মৃত্যুর পর ফাতিমা তাঁর ক্লিনিক বন্ধ করে আবার ভাইয়ের বাড়িতে ফিরে আসেন। তিনি জিন্নাহ ও তাঁর মেয়ে দিনার দেখাশোনার দায়িত্ব নেন।
পরবর্তী ১৯ বছর—১৯৪৮ সালে জিন্নাহর মৃত্যু পর্যন্ত—ফাতিমা তাঁর ভাইয়ের পাশে ছিলেন।
রাজনৈতিক জীবনেও জিন্নাহ ফাতিমাকে তাঁর পাশে রাখতেন। তিনি চাইতেন, উপমহাদেশের মুসলিম নারীদের জন্য ফাতিমা একটি আদর্শ হয়ে উঠুন। সভা ও রাজনৈতিক অধিবেশনগুলোতে তিনি ফাতিমাকে নিজের পাশে রাখতেন, পেছনে নয়।
আল-মুজাহিদ লিখেছেন, “নারীদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে পুরুষদের মতোই সব সুযোগ দেওয়া উচিত—জিন্নাহর এই বিশ্বাস তাঁর ছোট বোন ও অভিভাব্য ফাতিমা জিন্নাহর শিক্ষা ও কর্মজীবন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল।”
জীবনের শেষ পর্যন্ত জিন্নাহ তাঁর বোনের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন।
১৯৪৭ সালের আগস্টে করাচি ক্লাবে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন: “মিস ফাতিমা জিন্নাহ আমার জন্য সবসময় সাহায্য ও উৎসাহের উৎস। যখন আমি আশঙ্কা করছিলাম যে ব্রিটিশ সরকার আমাকে বন্দি করবে, তখন আমার বোনই আমাকে সাহস দিয়েছিলেন এবং আশাবাদী কথা বলেছিলেন... আমার স্বাস্থ্যের ব্যাপারেও তাঁর নিরন্তর যত্ন রয়েছে।”

জিন্নাহর সঙ্গে তাঁর মেয়ে দিনা।
১৯১৯ সালের ১৫ আগস্ট দিনার জন্ম। মায়ের মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র নয় বছর। মেয়েকে বড় করে তোলার জন্য জিন্নাহ তাঁর বোন ফাতিমার সাহায্য নেন।
এর কিছুদিন পর জিন্নাহ তাঁর মেয়ে ও বোনকে নিয়ে লন্ডনে যান এবং সেখানে আইন পেশায় যুক্ত হন।
পরিবারটি একটি তিনতলা ভিলায় থাকত। বোলিথোর বর্ণনায়, বাড়িটিতে “অনেকগুলো কক্ষ ও গেবল ছিল এবং একটি উঁচু টাওয়ার থেকে আশপাশের এলাকার চমৎকার দৃশ্য দেখা যেত।” বাড়ির সঙ্গে ছিল একটি লজ, গাড়ি চলাচলের পথ এবং আট একর বাগান ও চারণভূমি।
ভারতের তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা থেকে দূরে এই স্বস্তিদায়ক পরিবেশে জিন্নাহ ও দিনার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। বোলিথোর ভাষায়, দিনার “সঙ্গ দুজনের কাছেই আনন্দের হয়ে উঠেছিল।”
একবার জিন্নাহ তাঁর প্রিয় একটি বই Grey Wolf: An Intimate Study of a Dictator পড়তে দিনাকে জোর করেন। বইটি ছিল তুরস্কের নেতা কামাল আতাতুর্কের জীবন নিয়ে।
পরবর্তী অনেক দিন জিন্নাহ কামাল আতাতুর্কের প্রসঙ্গ এত বেশি আলোচনা করতেন যে দিনা তাঁকে ঠাট্টা করে ‘গ্রে উলফ’ নামে ডাকতে শুরু করেন।
দিনার সঙ্গে জিন্নাহর সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিল যে সংযত ও গম্ভীর স্বভাবের জিন্নাহর সঙ্গে এমন কিছু করার স্বাধীনতা একমাত্র তাঁর মেয়েরই ছিল।
বোলিথো লিখেছেন, “একমাত্র দিনাই তাঁর বাবাকে ঠাট্টা করতে পারতেন—যে স্নেহপূর্ণ আচরণের অভাব জিন্নাহ সারা জীবন অনুভব করেছিলেন।
একমাত্র দিনাই তাঁর মতো সরু ও অভিব্যক্তিপূর্ণ হাত বাড়িয়ে তাঁকে একটি নথি সরিয়ে রাখতে অনুরোধ করতে পারতেন।”
“চলুন, গ্রে উলফ, আমাকে একটি প্যান্টোমাইম দেখতে নিয়ে যান; শেষ পর্যন্ত তো আমি ছুটিতে আছি”—দিনা এভাবেই বাবাকে বলতেন।
তবে দিনা একজন অমুসলিম, নেভিল ওয়াদিয়াকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলে তাঁদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
আল-মুজাহিদের ভাষায়, এই সিদ্ধান্ত “জিন্নাহর কাছে পারিবারিক জীবনের সমাপ্তি” অর্থ বহন করেছিল।
দিনার যুক্তি ছিল—জিন্নাহও তো তাঁর মাকে বিয়ে করেছিলেন, যাঁর পারিবারিক পটভূমি ছিল অমুসলিম। তবে তিনি এ বিষয়টি উপেক্ষা করেছিলেন যে রতনবাই জিন্নাহকে বিয়ের আগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
সম্ভবত জিন্নাহ তাঁর নিজের ও রতনবাইয়ের দাম্পত্য জীবনে যে কষ্ট ও যন্ত্রণা এসেছিল, তা থেকে মেয়েকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন।
দিনা শেষ পর্যন্ত ওয়াদিয়াকে বিয়ে করেন। এতে বাবা-মেয়ের সম্পর্কের উষ্ণতা অনেকটাই কমে যায়। তাঁরা মাঝে মাঝে চিঠি আদান-প্রদান করতেন। কিন্তু জিন্নাহর চিঠিতে মেয়েকে ‘Mrs. Wadia’ বলে সম্বোধন করা হতো—যা সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকতারই ইঙ্গিত দেয়।
আল-মুজাহিদ পর্যবেক্ষণ করেছেন, “যখন ঘরোয়া সুখ হারিয়ে গেল এবং পারিবারিক আনন্দ বিলীন হলো, তখন তা জিন্নাহর মনে একটি ক্ষত তৈরি করে। সেই দুঃখ তাঁর চরিত্রেও প্রতিফলিত হয়েছিল।”

স্বভাবগতভাবে জিন্নাহ ছিলেন অত্যন্ত সংযত এবং তাঁর বন্ধুর সংখ্যাও ছিল কম। সরোজিনী নাইডু সম্ভবত তাঁর একমাত্র ঘনিষ্ঠ নারী বন্ধু ছিলেন, যাঁর প্রতি জিন্নাহর গভীর শ্রদ্ধা ছিল।
নাইডু ছিলেন খ্যাতিমান কবি ও রাজনীতিক। তিনি ‘ভারতের নাইটিঙ্গেল’ নামে পরিচিত ছিলেন। বিশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতীয় রাজনীতিতে তিনি কংগ্রেস দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নারী নেতা ছিলেন।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর নেহরু সরকার তাঁকে উত্তর প্রদেশের প্রথম নারী গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়।
জিন্নাহর প্রতি নাইডু গভীরভাবে মুগ্ধ ছিলেন। তাঁর শারীরিক সৌন্দর্য থেকে শুরু করে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা—সবকিছুরই তিনি প্রকাশ্যে প্রশংসা করতেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরেও তিনি জিন্নাহ ও তাঁর চিন্তাধারাকে আন্তরিকভাবে সমর্থন করতেন।
নাইডু জিন্নাহর বক্তৃতা ও লেখাগুলো সংকলন করে Mohammad Ali Jinnah: An Ambassador of Unity নামে একটি বই প্রকাশ করেন।
১৯১৭ সালের নভেম্বরে বইটিতে প্রকাশিত জিন্নাহর একটি প্রতিকৃতিতে তিনি লিখেছিলেন: “লম্বা ও সুঠাম, কিন্তু এমনভাবে রোগা যে প্রায় কঙ্কালসার মনে হয়—মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর এই ক্ষীণ দেহটি তাঁর অসাধারণ প্রাণশক্তি ও সহনশীলতার এক প্রতারণাময় আবরণ... নারীর মতো দ্রুত ও কোমল অন্তর্দৃষ্টি, শিশুর মতো প্রফুল্ল ও আকর্ষণীয় রসবোধ... তাঁর পার্থিব প্রজ্ঞার সুস্পষ্ট সুস্থতা ও প্রশান্তি তাঁর অন্তর্নিহিত লাজুক অথচ মহৎ আদর্শবাদকে কার্যকরভাবে আড়াল করে রাখে—যে আদর্শবাদই তাঁর মানবসত্তার মূল।”
জিন্নাহর মৃত্যুর কয়েক মাস পর, ১৯৪৯ সালের মার্চে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে সরোজিনী নাইডুও মারা যান।
এই নারীরা প্রত্যেকে ভিন্ন সামাজিক পটভূমি থেকে এসেছিলেন এবং তাঁদের জীবনের সময়কালও ছিল ভিন্ন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল—তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে ছিলেন শক্তিশালী নারী।
এটি জিন্নাহর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে—তিনি শক্তিশালী নারীদের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন এবং তাঁদের সম্মান করতেন।
আর এই বৈশিষ্ট্যটি সম্ভবত একজন শক্তিশালী মানুষেরই বৈশিষ্ট্য—তিনি শক্তিশালী নারীদের পাশে রাখতে ভয় পান না।
(লেখক সিন্ধু মাদ্রাসাতুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং ওয়াশিংটন ডিসির আমেরিকান ইউনিভার্সিটির সাবেক ফ্যাকাল্টি-ফেলো/ফুলব্রাইট স্কলার।)
Author