
ইয়েমেনের মায়ুন দ্বীপ—যা পেরিম নামেও পরিচিত—নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে হুথি বাহিনী। এর মধ্য দিয়ে লোহিত সাগরের পূর্ব উপকূলে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একটি কৌশলগত ঘাঁটি পেয়েছে গোষ্ঠীটি।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) বরাতে জানা গেছে, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা এবং হুথিদের একজন কর্মকর্তা শুক্রবার দ্বীপটি দখলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মায়ুন দ্বীপ দখল হুথিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অগ্রগতি। তারা যদি সেখানে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে পারে, তাহলে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে ইয়েমেনের চলমান সংঘাতের চিত্র বদলে যেতে পারে। একই সঙ্গে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে হুথিদের পৃষ্ঠপোষক ইরানও এর মাধ্যমে সুবিধা পেতে পারে।
মায়ুন দ্বীপ দখলের ঘটনা, হুথিরা সেখানে নিয়ন্ত্রণ কতটা সুসংহত করতে পারবে এবং এর ফলে ইয়েমেন ও এর বাইরের অঞ্চলে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে—এ নিয়ে যা জানা যাচ্ছে, তা হলো:
মায়ুন দ্বীপ একটি ১৩ বর্গকিলোমিটার (প্রায় ৫ বর্গমাইল) আয়তনের আগ্নেয় দ্বীপ। এটি লোহিত সাগরে প্রবেশের দক্ষিণ প্রান্তের সংকীর্ণ জলপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির একেবারে কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত।
২০২১ সালে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছিল, দ্বীপটিতে তাদের উপস্থিতি রয়েছে। এর আগে সেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিমানঘাঁটি নির্মাণের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। গত বছরের শেষ দিকে ইয়েমেন সংঘাত থেকে ইউএই তাদের সম্পৃক্ততা বন্ধ করে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। তবে মায়ুন দ্বীপের বিমানঘাঁটির বর্তমান অবস্থা এখনও স্পষ্ট নয়।

মায়ুন দ্বীপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে হুথিরা এখন বাব আল-মান্দেব প্রণালির ভেতরে সরাসরি একটি ঘাঁটি পেয়েছে। দ্বীপটি প্রণালিটিকে দুটি জলপথে বিভক্ত করেছে।
বৈশ্বিক নৌ-বাণিজ্যের জন্য বাব আল-মান্দেব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ, আর উত্তরে রয়েছে সুয়েজ খাল। মার্চে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের পর আরব উপদ্বীপের অপর প্রান্তে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
ইয়েমেনে আল-জাজিরার প্রতিবেদক ইউসেফ মাওরির তথ্য অনুযায়ী, বাব আল-মান্দেবের আশপাশের এলাকাগুলোও হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হানিশ দ্বীপ এবং ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল। বৃহস্পতিবার হুথিরা বন্দরনগরী মোখাও দখল করে।
নিরাপত্তা, নীতি ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাই বলেন, হুথিদের অগ্রযাত্রা এবং ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল দখলের ফলে তারা চাইলে বাব আল-মান্দেব দিয়ে যেকোনো ধরনের নৌ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার বাস্তব সক্ষমতা অর্জন করেছে।
এটি ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে হুথিদের লড়াইয়ে বড় ধরনের সুবিধা এনে দিয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের জন্যও এটি লাভজনক। কারণ এর মাধ্যমে বৈশ্বিক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর তেহরানের প্রভাব বাড়বে এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিজস্ব অবরোধকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন পুস্তাই।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেন, এই অগ্রগতি হুথিদের ‘অভ্যন্তরীণ’ লক্ষ্য যেমন পূরণ করছে, তেমনি ইয়েমেনের বাইরের বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের অবস্থানও শক্তিশালী করছে।
হুথিরা বলেছে, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব দিয়ে সাধারণ নৌ চলাচল নিরাপদ থাকবে। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে তারা অবরোধ করবে।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে গোষ্ঠীটি ‘অবরোধের জবাবে অবরোধ’ এবং ‘উত্তেজনার জবাবে উত্তেজনা’ নীতি অব্যাহত রাখবে। সৌদি আরব হুথি-নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় অবরোধ আরোপ করেছে।
তবে অতীতে হুথিরা সৌদি আরবের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই—এমন জাহাজও আঞ্চলিক জলসীমায় লক্ষ্যবস্তু করেছে।
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত হুথিরা লোহিত সাগরে ১০০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
গোষ্ঠীটি দাবি করেছিল, গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইসরায়েল বা তার মিত্রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করেই এসব হামলা চালানো হয়েছে। তবে রয়টার্স ও বিবিসি ভেরিফাইয়ের উদ্ধৃত নৌ-বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কিছু হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল এমন জাহাজ, যেগুলোর সঙ্গে ইসরায়েল বা তার মিত্রদের কোনো দৃশ্যমান সম্পর্ক ছিল না।
হুথিরা যদি আবার সৌদি জাহাজের বাইরে অন্যান্য জাহাজকেও লক্ষ্যবস্তু করা শুরু করে, তাহলে নতুন অবস্থান থেকে চলাচলরত জাহাজে হামলা চালানো তাদের জন্য আরও সহজ হতে পারে।

পুস্তাই বলেন, হুথিরা তখন জাহাজে হামলার জন্য দীর্ঘপাল্লার কামানের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে। হুথিরা যদি নৌ চলাচলের অনুমতি না দেয়, তাহলে প্রণালিটি দিয়ে যাতায়াত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অর্থনীতিবিদ জাভেদ হাসানের মতে, লোহিত সাগরে নৌ-বাণিজ্যে আরও কোনো ধরনের বিঘ্ন তৈরি হলে এর প্রভাব ইতোমধ্যেই চাপের মধ্যে থাকা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপকভাবে পড়তে পারে।
তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, পণ্য পরিবহন আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাহত হওয়ার আগেই যুদ্ধঝুঁকি বীমা ও জাহাজ ভাড়ার হার বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব শুধু তেলের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না; কনটেইনার পরিবহন, বাল্ক পণ্য পরিবহন এবং সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের খরচও বেড়ে যেতে পারে।
অর্থাৎ, হুথিদের হামলার কারণে সরবরাহে যে ধাক্কা তৈরি হবে, তা একই সঙ্গে বিভিন্ন পণ্যের বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে।
হুথিরা দখল করা দ্বীপটি কতটা সময় ধরে রাখতে পারবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী দ্বীপটি পুনর্দখলের জন্য কতটা চেষ্টা করে তার ওপর। কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, হুথিদের অগ্রযাত্রার সময় সরকারি বাহিনী দ্রুত সরে গেছে বলে জানা গেছে।
ক্রিগের মতে, আশপাশের এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণে থাকায় স্বল্পমেয়াদে মায়ুন দ্বীপ ধরে রাখার ক্ষেত্রে হুথিরা শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রপথে উভচর সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দ্বীপটি পুনর্দখলের চেষ্টা হলে সেটি প্রতিরোধ করা কঠিন হতে পারে। অবশ্য এমন অভিযান চালানোও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

ক্রিগ বলেন, মূল বিষয় হবে ইয়েমেনের মূল ভূখণ্ডের উপকূলীয় অঞ্চল এবং এর পেছনের বিস্তৃত এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেন, হুথিদের দ্রুত লোহিত সাগর উপকূল পেরিয়ে পেরিম দ্বীপে পৌঁছে যাওয়া খুব একটা বিস্ময়কর নয়।
তার মতে, সরকারি বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং দুর্বল অস্ত্রসজ্জা এর অন্যতম কারণ। যদিও সৌদি আরবের সমর্থনে গত এক বছর ধরে সরকারি বাহিনীকে একটি কার্যকর সামরিক শক্তিতে পরিণত করার চেষ্টা চলেছে। অন্যদিকে, হুথিরা কয়েক বছর ধরে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে এসেছে।
আয়ারল্যান্ড সফরের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, হুথিরা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ না করার অনুরোধ করেছে।
ট্রাম্প বলেন, হুথিরা ‘আমাদের ফোন করেছে’। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায় না—এ কথা তারা জানিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, হুথিরা যুক্তরাষ্ট্রকে সংঘাতে না জড়াতেই বেশি আগ্রহী এবং তারা বেশিরভাগ জাহাজকে চলাচলের সুযোগ দিচ্ছে। তবে একটি দেশের সঙ্গে তাদের বড় ধরনের বিরোধ রয়েছে এবং সেটি যুক্তরাষ্ট্র সমাধান করবে।
ট্রাম্প আরও বলেন, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তার ‘ভালো বন্ধু’ এবং শেষ পর্যন্ত সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
Author