
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে দায়িত্ব পালনকালে দুই মুসলিম নারী সাংবাদিককে আটক ও পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ নতুন করে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দক্ষিণ দিল্লির সাকেত এলাকায় একটি সরকারি অনুষ্ঠানের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক শাহীনা খান ও নাফিসা খান পুলিশের হাতে আটক এবং মারধরের শিকার হয়েছেন। তারা ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম 4PM News Network-এর সঙ্গে যুক্ত।
ঘটনার পর আহত অবস্থায় দুই সাংবাদিকের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ভারতজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সাংবাদিক সংগঠন, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন মহল ঘটনার নিন্দা জানায়। একই সঙ্গে Press Council of India-সহ সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার দক্ষিণ দিল্লির সাকেত এলাকায় Max Smart Super Speciality Hospital-এর একটি নতুন উইং উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে আয়োজিত অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা অনুষ্ঠানের সংবাদ সংগ্রহ এবং মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার চেষ্টা করছিলেন। এ সময় পুলিশ তাদের বাধা দেয় এবং পরে সাকেত থানায় নিয়ে যায়। সেখানে তাদের মারধর করা হয় বলে তারা অভিযোগ করেন।

প্রকাশিত ভিডিওতে শাহীনা খানকে থানার ভেতরে নিজের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখাতে দেখা যায়। অপর একটি ভিডিওতে নাফিসা খানকে হাঁটতে না পেরে অন্যদের সহায়তায় বের হতে দেখা যায়। দুই সাংবাদিকের অভিযোগ, তাদের লাঠি দিয়ে পেটানো এবং চড় মারা হয়েছে।
মুসলিম পরিচয় জানার পর নির্যাতন বাড়ানোর অভিযোগ
ঘটনার সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো—শাহীনা খান অভিযোগ করেছেন, পুলিশ তার নাম জানার পর তিনি মুসলিম কি না, তা জানতে চায়। পরে তার মোবাইল ফোনে ‘Mohammed’ নামে সংরক্ষিত একজনের কল আসার পর একজন পুলিশ সদস্য তাকে উদ্দেশ করে বলেন, “Muslim hai… do dande zyada maaro”—অর্থাৎ, “মুসলিম, আরও দুই বাড়ি লাঠি মারো।”
এই অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু একজন সাংবাদিকের ওপর বেআইনি বলপ্রয়োগের ঘটনা নয়; বরং ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক আচরণ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি গুরুতর উদাহরণ।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগ
একজন সাংবাদিক দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশের হাতে আটক বা জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে পারেন—যদি তিনি আইন ভঙ্গ করেন, সেটি তদন্তের বিষয়। কিন্তু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করার কোনো সুযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নেই।
বিশেষ করে একজন নারী সাংবাদিককে থানায় নিয়ে গিয়ে মারধরের অভিযোগ এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নির্যাতন বাড়ানোর অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ধরনের ঘটনা সাংবাদিকদের মাঠপর্যায়ে কাজ করার ক্ষেত্রে ভয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি করতে পারে। ফলে এর প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দুই সাংবাদিকের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সামগ্রিকভাবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা এবং জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর Press Club of India, Indian Women’s Press Corps, Delhi Union of Journalists, Press Association এবং Kerala Union of Working Journalists যৌথভাবে দুই সাংবাদিকের ওপর কথিত হামলার নিন্দা জানিয়েছে।

সাংবাদিক সংগঠনগুলোর এই প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংবাদিকদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো ধরনের হামলা বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন
সাংবাদিকরা বলছেন, তাদের বেআইনিভাবে আটক ও মারধর করা হয়েছে এবং মুসলিম পরিচয় জানার পর নির্যাতন বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, তারা নির্ধারিত ভিআইপি রুটে বাধা সৃষ্টি করেছিলেন এবং সাংবাদিকদের অভিযোগ ভিত্তিহীন।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত। থানার সিসিটিভি ফুটেজ, ঘটনাস্থলের ভিডিও, সাংবাদিকদের মোবাইল ফোনের তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করা প্রয়োজন।
দিল্লির এই ঘটনা ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। একজন সাংবাদিকের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয় যাই হোক না কেন, দায়িত্ব পালনকালে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
Author