
(১)
দিনেশ ত্রিবেদীর কূটনৈতিক জেশ্চার ইন্টারেস্টিং। তিনি বিমানে উড়ে না এসে সীমান্ত দিয়ে হেঁটে পার হয়েছেন। বলা যায়, তার কূটনীতির শুরুটা একেবারে ’গ্রাউন্ড জিরো’ থেকে। তিনি আরেকটা কারণে ব্যতিক্রম। রাজনীতির মাঠ থেকে স্পেশাল অ্যাসাইনমেন্টে কূটনীতিক হয়েছেন তিনি। কূটনীতি তারা চাকরি নয়। মিস্টার ত্রিবেদী, ওয়েলকাম আপনাকে। নতুন মাঠে, নতুন খেলায়।
(২)
বাংলাদেশে পা রেখেই তিনি যে ডিসকোর্স তুলে ধরেছেন তা তাৎপর্যপূর্ণ। বলেছেন, “একই আকাশ, একই বাতাস, একই যন্ত্রণা।”আরও বলেছেন, ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষকে যোগ করে ১৬০ কোটি মানুষের কথা তিনি একসাথে ভাবছেন। কথাগুলো শুনতে খুব মিষ্টি। কিন্তু কূটনীতিতে স্থান, কাল ও পাত্রভেদে সুন্দর কথারও নানা রকম অর্থ হয়। গণযোগাযোগের বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই বলেন, কোনো কথার অর্থ তাই নয়, যা বক্তা বলেন; বরং আসল অর্থ সেটাই যেটা শ্রোতার মনে করে। কাজেই আমরা বুঝতে চাই, ত্রিবেদীর এই বাণীর কী অর্থ বাংলাদেশী নাগরিকদের মননে প্রতিধ্বনিত হয়।
(৩)
বাহ্যিক দৃষ্টিতে ত্রিবেদীর বক্তব্য খুবই অগ্রসর। বাংলাদেশ ও ভারতের ইতিহাস, নদী, আবহাওয়া, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবন বহু জায়গায় একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। সীমান্তের দুই পাশে একই ভাষায় গান হয়, একই খাবার রান্না হয়, একই নদীর পানি দিয়ে মানুষ চাষাবাদ করে। জলবায়ু পরিবর্তন, বণ্যা, ঘূর্ণিঝড়, দারিদ্র্য, সীমান্তের দুই পাশের সন্ত্রাস বা আতঙ্কবাদের মতো সমস্যাও উভয় দেশের কমন চ্যালেঞ্জ বলে বিবেচিত। সে অর্থে “একই আকাশ”বলতে সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও যৌথ উদ্যোগের একটি সুন্দর আহ্বান মনে হওয়ার কথা।
দৃশ্যত, মিস্টার ত্রিবেদীর কথায় যেটা মিসিং, সেটা হলো, তিনি ১৬০ কোটি মানুষকে একই ভাবছেন; কিন্তু তার দেশের ১৪০ কোটি মানুষের জাতীয় আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের জাতীয় আকাঙ্ক্ষার মৌলিক তফাৎ রয়েছে, তা তার মাথায় আসেনি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার ভিত্তি হলো, ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে মুসলিম ধর্ম পরিচয়ের দাবি আর ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার। এই দুয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এঅঞ্চলের ‘মুসলিম-বাংলাদেশী‘ পরিচয়ের স্বাতন্ত্র্য। অন্যদিকে দিল্লিতে যারা ত্রিবেদীর নিয়োগকর্তা, তারা আসমূদ্রহিমাচল একটি বৃহত্তর ভারতীয় সভ্যতাকে বা অভিন্ন পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখে। এই দুই ভাবনার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এই দুই পরিচয়ের পার্থক্যকে ভূলে গিয়ে ১৬০ কোটিকে এক করে দেখার ভাবনাকে সতর্কভাবে বোঝা দরকার।
(৪)
অনস্বীকার্য যে, সমমর্যাদায় দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার বিনিময় হলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী বড় অর্থনৈতিক শক্তি হতে পারে। কিন্তু প্রতিনিয়ত ভারতে যেভাবে পরিচয় ভুলিয়ে দেওয়ার রাজনীতি চলছে, তার প্রেক্ষাপটে দাড়িয়ে বাংলাদেশীদের মননে এই বক্তব্য থেকে এটা মনে হতেই পারে যে, একসঙ্গে দেখতে গিয়ে ২০ কোটি মানুষের কণ্ঠ, ১৪০ কোটির ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারে।
বৈচিত্র্য বাদ দিয়ে ঐক্যের কথা বলা কখনোই নিরাপদ নয়। একটি বাগানে সব ফুলকে একই রঙে রাঙালে তাকে আর বৈচিত্র্যময় বাগান বলা যায় না। সেজন্যই মিস্টার ত্রিবেদীর ১৬০ কোটির একই আকাশের ধারণার মধ্যে বৈচিত্র্যকে ইগনোর করা বার্তা আছে। বরং দুই দেশ আলাদা থাকবে, পরস্পরের সীমা ও সিদ্ধান্তকে সম্মান করবে, তারপর যেখানে স্বার্থ মেলে সেখানে একসঙ্গে কাজ করবে। এটাই কূটনীতির শিষ্টাচার, যা মিস্টার ত্রিবেদীর প্রথম বয়ানে অনুপস্থিত।
(৫)
কেউ কেউ নানাভাবে বলার চেষ্টা করছেন যে, ত্রিবেদীর বক্তব্যকে অখণ্ড ভারতের ঘোষণার ইকো নয়। তিনি পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহযোগিতার ইশারা করেছেন। তবে বাংলাদেশের নাগরিকদের এই কথার ভেতরে অখণ্ড ভারতের প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়ার যৌক্তিকতা আছে। কারণ, যখন বড় রাষ্ট্রের প্রতিনিধি বলেন, “আলাদাভাবে ভাবছি না” বা “একই আকাশ’, তখন তা ছোট প্রতিবেশীর নিকট তার পৃথক রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রতি ইগনোরেন্স হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
ত্রিবেদীর “একই যন্ত্রণা” কথাটিও অর্ধসত্য। আমাদের কিছু সমস্যা একই, কিন্তু অবস্থান এক নয়। একই নদী ভারত ও বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হলেও ভারত উজানে, বাংলাদেশ ভাটিতে। উজানের দেশ পানি আটকে দিলে বা একতরফা নিয়ন্ত্রণ করলে ভাটির দেশের কৃষক, জেলে ও নদীনির্ভর মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। আকাশ একই হতে পারে, নদীও একই হতে পারে, কিন্তু ক্ষমতা ও ভোগান্তি এক নয়। একজন বাঁধের দরজা নিয়ন্ত্রণ করেন, অন্যজন সেই দরজা খোলা বা বন্ধ থাকার ফল ভোগ করেন। বরং, ভারত নিজেই বাংলাদেশের জন্য যন্ত্রণার চাক্ষুশ কারণ। এই সত্য এড়িয়ে গিয়ে দুই দেশের ‘যন্ত্রণা’ একই বলার মধ্যেও ডিনায়াল লুকিয়ে আছে।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। এন্ট্রি ডাম্পিংসহ নানা ক্ষেত্রে যে অশুল্ক বাধা, তা না কমিয়ে ১৬০ কোটি মানুষকে একই দেখার মানে হলো, বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের পুঁজি ও পণ্যও স্বকীয়তা হারাবার শঙ্কায় পড়বে। এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নানা তত্ত্বে।
(৬)
প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে মিস্টার ত্রিবেদীর এই বয়ানের প্রতিক্রিয়া কী হবে? আমার মনে হয়, বাংলাদেশে তিনি এসেছেন এনভয় হিসেবে। তিনি তার দেশের কথা বলবেন, এটাই স্বাভাবিক। তিনি সেটাই বলেছেন। তিনি সহযোগিতার কথা বলেছেন, আবার ভুলে যান নাই স্মরণ করিয়ে দিতে যে, তার দেশ আকারে, জনসংখ্যায় ’বড়’। এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিৎ ‘ইতিবাচক’ এবং ‘স্পষ্ট’। একই আকাশের নিচে থাকা মানে একই রাষ্ট্র হওয়া নয়। একই বাতাসে শ্বাস নেওয়া মানে একই স্বার্থ বহন করাও নয়। বন্ধুত্ব তখনই টেকে, যখন মিলের সঙ্গে অমিলকেও স্বীকার করা হয়। এই সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করুক বাংলাদেশের রাজনীতিক ও কূটনীতিকরা।
সেক্ষেত্রে কূটনীতিতে নবীন এই দূতকে বার্তা দেওয়া দরকার যে, “একই আকাশ”তত্ত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হোক কাজে, কথায় নয়। ভারত যদি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্য, সীমান্তে নিরাপত্তা, পানির ন্যায্য হিস্যা আর বাজারে সমান সুযোগকে সম্মান করে, তাহলে একথা আঞ্চলিক সহযোগিতার শক্তিশালী দর্শন হতে পারে। আর যদি ঐক্যের মিষ্টি ভাষার আড়ালে বাংলাদেশের আলাদা পরিচয় ও স্বার্থকে ছোট করা হয়, তাহলে একই আকাশের কথা বাংলাদেশের মানুষের কাছে আধিপত্যবাদের ছায়া হিসেবেই ধরা দেবে।
Author