
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান যে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তাঁর ৮০তম জন্মদিনে একটি শান্তি চুক্তি উপহার দেবে, এমন সম্ভাবনা শুরু থেকেই খুবই ক্ষীণ ছিল। এমনকি কোনো সীমিত পরিসরের চুক্তি হলেও ট্রাম্প সেটিকে নিজের কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে প্রচার করতেন। তবে ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর পর বহুবার শান্তি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলেও সেগুলোর কোনোটিই বাস্তবে রূপ নেয়নি। ফলে নতুন সমঝোতা স্মারক (MoU) নিয়ে আশাবাদ থাকলেও সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের আলোচনা চলছে, সেটি যদি সত্যিই বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এ মুহূর্তে পাওয়া তথ্য বলছে, এই সমঝোতা স্মারক মূলত ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি তৈরির একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার মাত্র। এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তি নয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধানের নিশ্চয়তাও দেয় না।
বাস্তবতা হলো, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির বাইরে এর অর্থনৈতিক অভিঘাতও ছিল ব্যাপক। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলেছে। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়েছে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলো।
যদি সমঝোতা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, কাঁচামাল ও অন্যান্য পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। বাজারের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়াও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিনিয়োগকারীরা পরিস্থিতির উন্নতি প্রত্যাশা করছেন।
তবে স্থায়ী শান্তির পথে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাধা হিসেবে রয়ে গেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তাঁর দৃষ্টিতে দুর্বল ইরান মানেই নিরাপদ ইসরায়েল। ফলে ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে তা ইসরায়েলের বর্তমান নিরাপত্তা কৌশলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। দক্ষিণ লেবানন ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে তেল আবিবের আগ্রহ সীমিত।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মার্কিন সিনেটের অনুমোদন ছাড়া এই সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ পাবে না। রিপাবলিকান দলের একাংশ, বিশেষ করে ইসরায়েলপন্থী আইনপ্রণেতারা, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা বা জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করার মতো বিষয়গুলোকে কঠোরভাবে বিরোধিতা করতে পারেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত ইরানকে দুর্বল না করে বরং কিছু ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। যুদ্ধের ফলে ইরান তার অন্যতম কৌশলগত শক্তি—হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব—নতুনভাবে প্রদর্শনের সুযোগ পেয়েছে। সামরিক শক্তির তুলনায় বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য প্রবাহকে প্রভাবিত করার এই সক্ষমতা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে সামনে এসেছে।
ফলে বর্তমান সমঝোতা স্মারককে চূড়ান্ত শান্তি প্রতিষ্ঠার সূচনা হিসেবে নয়, বরং একটি সাময়িক রাজনৈতিক বিরতি হিসেবে দেখা অধিক বাস্তবসম্মত। মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ, আঞ্চলিক প্রক্সি সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা—এসব মৌলিক প্রশ্নের টেকসই সমাধান প্রয়োজন। অন্যথায় আজকের সমঝোতা আগামী দিনের আরেকটি সংকটের সূচনা মাত্র হতে পারে।
Author