লন্ডনের বিখ্যাত ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্ট বাংলাদেশের পোশাক খাতের অবস্থা নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। পলিসি পেপারের পাঠকদের জন্য আমরা লেখাটির অনুবাদ প্রকাশ করছি

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তীব্র চাপে রয়েছে। এর ফলে রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট, জ্বালানি ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে, অর্ডার হ্রাস পেয়েছে এবং হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। এতে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি আয়কারী খাত হিসেবে পরিচিত পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ আপাতত শেষ হলেও, বাংলাদেশ এখনও তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের স্পিনিং, নিটিং ও ডাইং কারখানাগুলো বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস এবং পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ব্যবহার করে। দেশের মোট তেল ও গ্যাস আমদানির প্রায় ৯৫ শতাংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। ফলে সরবরাহে বিঘ্ন বা মূল্যবৃদ্ধি হলে এই শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জ্বালানির বাড়তি মূল্য উৎপাদকদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। ৬ জুন দেশের অন্যতম বড় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আল-মুসলিম গ্রুপ ঢাকার তাদের নিটওয়্যার ও ডেনিম কারখানা থেকে প্রায় ১,৯০০ শ্রমিককে ছাঁটাই করে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ৪০ লক্ষেরও বেশি মানুষ কাজ করেন, যাদের অধিকাংশই নারী। তারা Zara, H&M-এর মতো পশ্চিমা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পোশাক তৈরি করেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪ কোটি মানুষ—অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ—এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।
গত বছর বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ এসেছে পোশাক খাত থেকে এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (GDP)-এর প্রায় ১৩ শতাংশ অবদান রেখেছে এই শিল্প। চীনের পর বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ।
মে মাসে সরকার ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রাখে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রামে অনেক সময় দিনে আট ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। উৎপাদন সচল রাখতে অনেক কারখানার মালিক ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছেন। তবে সময়নির্ভর এই শিল্পে জেনারেটর চালু করতে যে ১০–১৫ মিনিট সময় লাগে, তাতেই বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় বলে জানান বাংলাদেশ এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ-এর আবিল বিন আমিন।
ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে পোশাক উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। উৎপাদনে বিলম্ব, পরিবহন ব্যাহত হওয়া এবং পশ্চিমা বাজারে ভোক্তাদের চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো তাদের অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে। ঢাকার একটি জ্যাকেট কারখানার মালিক আবদুল্লাহ হিল নকীব জানান, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে তার অর্ডার প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে টানা দশম মাসের মতো পোশাক রপ্তানি কমেছে এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে কাঁচামালের দামও বেড়েছে। সিন্থেটিক ফাইবার, রং, ফিনিশিং কেমিক্যাল, প্লাস্টিকের বোতাম ও জিপার—সবই পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল। এগুলো মিলিয়ে একটি পোশাক তৈরির মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ গঠন করে। বাংলাদেশে উৎপাদিত প্রায় ৩০ শতাংশ পোশাকে ন্যাফথা থেকে তৈরি পলিয়েস্টার ফাইবার ও সুতা ব্যবহৃত হয়, যার দাম সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প অত্যন্ত খণ্ডিত। যদিও কিছু উল্লম্বভাবে সমন্বিত (vertically integrated) টেক্সটাইল মিল রয়েছে, অধিকাংশ কারখানা উৎপাদনের কেবল একটি ধাপ সম্পন্ন করে। ফলে বিভিন্ন ধাপে পণ্য পরিবহনের প্রয়োজন বাড়ে। আবদুল্লাহ হিল নকীবের মতে, তার পরিবহন ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকটে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে, যার সবচেয়ে বড় অংশ বরাদ্দ করা হয় পোশাক খাতের জন্য। তবে এসব ঋণের সুদের হার প্রায় ৭ শতাংশ হওয়ায়, আর্থিকভাবে ইতোমধ্যে চাপে থাকা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ঋণ গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময়ের মতো এবারও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি নয়। পরিস্থিতি এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০টি কারখানায় আনুমানিক ৯,৫০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের মতো আবারও শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
৭ জুন সামলি খাতুন কর্মস্থল মাধবপুরের কর্টেক্স অ্যাপারেলস কারখানায় এসে দেখেন, কারখানার ফটকে ছাঁটাইয়ের নোটিশ টাঙানো রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমার জন্য আরেকটি চাকরি খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন হবে। একজন নারী হিসেবে আমার সুযোগ-সুবিধা সীমিত। হয়তো আমার গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’
Author