
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এক অনন্য ঐতিহাসিক অধ্যায়। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং জনগণের দীর্ঘদিনের গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা, ন্যায়বিচারের দাবি এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ের এক অভূতপূর্ব বহিঃপ্রকাশ। ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ, সাহস এবং ঐক্য আমাদের জাতীয় ইতিহাসে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছে। জুলাই আমাদের শিখিয়েছে জনগণের শক্তির চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই এবং গণতন্ত্রকে কখনোই দমন-পীড়নের মাধ্যমে চিরস্থায়ীভাবে স্তব্ধ রাখা যায় না।
দীর্ঘ সময় ধরে দেশের মানুষ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা, বৈষম্য, দুর্নীতি ও জবাবদিহিতার সংকটে হতাশ ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল একটি জাতীয় জাগরণ, যেখানে ছাত্র, তরুণ, শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষক, অভিভাবকসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের দাবি ছিল শুধু পরিবর্তনের নয়, একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার।
এই আন্দোলনের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি ছিল দেশের তরুণ প্রজন্ম। তারা আমাদের দেখিয়েছে, আদর্শ, দেশপ্রেম ও ন্যায়বোধ যখন একত্রিত হয়, তখন কোনো অপশক্তি জনগণের অগ্রযাত্রা থামিয়ে রাখতে পারে না। অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগ, আহতদের ত্যাগ ও সংগ্রাম আমাদের জাতীয় চেতনায় চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে। তাদের রক্তের ঋণ পরিশোধের একমাত্র উপায় হলো এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে আইনের শাসন, মানবিক মূল্যবোধ এবং নাগরিক অধিকার সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষা। কারণ একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। প্রাথমিক শিক্ষা শুধু বর্ণপরিচয় বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা নয়; এটি একজন নাগরিকের চরিত্র, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের ভিত্তি নির্মাণ করে। তাই জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নের সবচেয়ে কার্যকর ক্ষেত্র হলো শিক্ষা।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়ে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রতিটি শিশু শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়, বরং একজন মানবিক, সৃজনশীল, যুক্তিবাদী ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠবে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে বেরিয়ে এসে চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, প্রযুক্তি-জ্ঞান, নৈতিকতা এবং সৃজনশীলতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
একটি মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে হলে শিক্ষায় বৈষম্যের অবসান অপরিহার্য। শহর ও গ্রামের মধ্যে, পাহাড়, চর, হাওড় ও উপকূলীয় অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে, কিংবা আর্থ-সামাজিক অবস্থার কারণে কোনো শিশুই যেন মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়—এটি নিশ্চিত করাই আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কারণ সুযোগের সমতা ছাড়া মেধা বিকাশ সম্ভব নয়।
আমরা এমন একটি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে আনন্দময় শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানচর্চা এবং মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটবে। একই সঙ্গে শিক্ষককে হতে হবে পরিবর্তনের প্রধান কারিগর। একজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও অনুপ্রাণিত শিক্ষকই পারে একটি প্রজন্মকে আলোকিত করতে।
আজ আমাদের সামনে যে বাংলাদেশ নির্মাণের সুযোগ এসেছে, তা কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে পূর্ণতা পাবে না; এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষা, সুশাসন, সততা, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা। জুলাইয়ের আত্মত্যাগ তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রতিটি শিশু সমান সুযোগ পাবে, প্রতিটি নাগরিক আইনের সমান সুরক্ষা পাবে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে।
আমি বিশ্বাস করি, গণজাগরণের শক্তিকে যদি আমরা শিক্ষার শক্তিতে রূপান্তর করতে পারি, তবে বাংলাদেশ কেবল উন্নয়নশীল নয়, একটি সত্যিকার অর্থেই মেধাভিত্তিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এটাই হোক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি আমাদের শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং নতুন বাংলাদেশের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার।
(ববি হাজ্জাজ একজন বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ, বর্তমান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। তিনি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-১৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান ও দলটির চেয়ারম্যান ছিলেন।)

Author