
ইসলামী ব্যাংকে এস আলমের পুনর্বাসনের বিরুদ্ধে লিখলে বিএনপির কিছু লোক এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরা কোথায় জানি শিখছে, ফান্ডিং বন্ধ করে জামায়াতকে সাইজ করতে হলে ইসলামী ব্যাংককে দখলে রাখতে হবে। অবিকল এই চিন্তাটাই করত আওয়ামী লীগের লোকজন। আর এই বয়ান দিয়েই ইসলামী ব্যাংক দখল করতে দেওয়া হয় এস আলমকে। এর পরিণতি কী হয়েছে, তা দেখেও শিক্ষা হচ্ছে না।
এই বোকাচন্দ্ররা বুঝতে পারছে না, বর্তমান সরকারকে রক্ষার জন্যই ব্যাংকিংখাতকে বাঁচাতে হবে। এস আলম এবং তাঁর প্রতি সহানুভূতি রাখে এমন লোকজনকে ঘাড় ধরে বের করে দিতে হবে। আগে বহুবার বলেছি, আবার বলছি, শেখ হাসিনার পতন অভ্যুত্থানে হয়নি। হয়েছিল অর্থনৈতিক সংকটের কারণে। আগে অর্থনীতি ভালো ছিল বলে, মানুষ ২০১৪, ২০১৮ মেনে নিয়েছিল। ২০২২ সাল থেকে অর্থনৈতিক সঙ্কট শুরুর প্রত্যেকের জীবন চাপে পড়েছিল। ফলে ২০২৪ সালে বিক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নেমে শেখ হাসিনার পতন ঘটনায়।
আর অর্থনৈতিক সংকটটা হয়েছিল, এস আলমের মত লোকজন ব্যাংক দখল করে ঋণের নামে টাকা বের করে পাচার করায়। এতে সংকটের 'চেইন রিয়েকশন' তৈরি হয়েছিল। যেমন দেশ থেকে পাচারের কারণে রেমিট্যান্স ও রপ্তানির ডলার দেশে আসেনি। তাতে ডলার সংকট হয়ে টাকার মান কমেছে। এতে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। ডলার না থাকায় সরকার তেল, গ্যাস আমদানি করতে পারছিল না। তাতে লোডশেডিং হয়ে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কমেছে। তাতে রপ্তানি আরও নিম্নমুখী হয়েছে। তাতে ডলার আয় আরও কমেছে। ডলারের নাম আরও বেড়েছে। জিনিসপত্রের নাম আরও বেড়েছে। সবশেষে অতিষ্ঠ মানুষের ধৈর্য্যের শেষ সীমা ভেঙেছে জুলাইয়ে রক্ত দেখে। আবারও বলছি, জুলাই ছিল অর্থনৈতিক সংকটের অভ্যুত্থান।
সেই ২০১৯ সাল থেকে বলছি, বিএনপি, জামায়াত শেখ হাসিনার জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল না। চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থনীতি। ২০২৪ সালের নির্বাচনের পরও বলেছি, ইকনোমি ক্র্যাশ করলে সরকারের পতন হবেই। বিরোধী দল লাগবে না। একই কথা আবারও বলছি, জামায়াত-এনসিপি বা আওয়ামী লীগ তারেক রহমানের জন্য চ্যালেঞ্জ নয়। ইকোনমি ঠিক থাকলে, টুকটাক আকাম, দুর্নীতি করেও সরকার ভালোভাবে টিকে থাকবে। নিত্যপণ্যের দাম ও কর্মসংস্থান ঠিক থাকলে, সরকারকে চ্যালেঞ্জ করার ফ্যাক্টর মার্কেটে নেই।
কিন্তু জামায়াতকে সাইজ করার মনোবাসনায় ইসলামী ব্যাংক দখল করতে গেলে বা দখল করতে দিলে, পুরনো সেই লুটেরা চক্র ফিরবে। সঙ্গে নিয়ে আসবে সেই চেইন রিয়েকশন। শেখ হাসিনার সুবিধা ছিল, ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যে অর্থনীতি তৈরি হয়েছিল, তা ধ্বসে সময় লেগেছিল। তারেক রহমান পেয়েছেনই ভঙ্গুর অর্থনীতি। এখান থেকে অল্পবিস্তর চুরি সুযোগ থাকলেও, এস আলম স্টাইলে লুটের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদই নাই। কিন্তু সেই সময়ে ১০-২০ শতাংশ লুট হলেও, অর্থনীতি হোমাসা হয়ে যাবে।
সরকার কোথাও তার নিজের লোক দেবে, এটা সমস্যা না। সরকার দিতেই পারে। কারণ সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব ও দায় দুটোই সরকারের। সরকারের কাছে লোকের অভাবও নাই। সমস্যা হলো এস আলমের লোক হিসেবে পরিচিত কাউকে নিয়োগ দিলে। কারণ সে সরকারের নয়, অলিগার্কদের পাসপাস সার্ভ করবে। যা অর্থনীতির আরও ক্ষতি ও গ্রাহকের কনফিডেন্স নষ্ট করবে।
বাংলাদেশের ব্যাংকের গভর্নরই স্পষ্ট করে বলেছেন, ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণের নামে পাঁচ লাখ কোটি টাকা চুরি হয়েছে। এসব ঋণের বিপরীতে বন্ধক বা জামানত নেই।
এই কথার সাদা বাংলা হলো, এইসব টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না। যেমন এস আলম নিয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। সব বন্ধক, শেয়ার, জমি, ঘটিবাটি মিলালেও দেশে এস আলমের সম্পদ নেই ২০-২৫ হাজার কোটি টাকার। আর পাখি আগেই উড়ে বিদেশে চলে গেছে। এখন দেশে থাকা ২০-২৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ নিলাম তুললেও, বাকি ২ লাখ কোটি টাকা আর পাওয়া যাবে না। পাওয়া সম্ভব না।
আর এস আলম তো বাকি ২ লাখ কোটি টাকা একা খায়নি। সেই বা এই টাকা ফেরত দেবে কোথা থেকে। ব্যাংক দখল, ঋণ তোলা এবং পাচার প্রতি ধাপে ঘাটে ঘাটে টাকা দিতে হয়েছে। সেই বড়জোর ৭০-৭৫ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। বাকি টাকা সেই সময়ে মন্ত্রী, সান্ত্রী, রয়েল ফ্যামেলি নিয়েছে। ফলে টাকা চলে গেছে মায়ের ভোগে।
একটা রাফ হিসাব হলো, এস আলম এবং তার মত অন্যরা মিলিয়ে যে ৫ লাখ কোটি টাকা নিয়েছে, এর মধ্যে লাখ খানেক কোটি টাকা সম্পদ, শেয়ার, বন্ধক বিক্রি করে পেলেও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাকি ৪ লাখ কোটি কাল কিয়ামতের সকাল পর্যন্ত পাওয়া যাবে না।
কিন্তু ব্যাংকে আমানত রাখা গ্রাহককে তো টাকা ফেরত দিতে হবে। কিন্তু কে দেবে এই টাকা? টাকা না পেলে তারা পথে বসে যাবে। আর যদি ব্যাংকগুলো দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়, তাহলে ইকোনমি ভেঙে পড়বে। আবার সরকার যদি ছাপিয়ে টাকা ফেরত দেয়, তাহলে মূল্যষ্ফীতিতে পাবলিকের পকেটে জাঙিয়া কেনার টাকা থাকবে না।
তাই বোকাচন্দ্ররা ইসলাম ব্যাংক থেকে জামায়াতের ইয়ানত আদায় বন্ধ করতে গিয়ে, ব্যাংক খাতকে নিয়ন্ত্রণে খুশি হচ্ছেন, তারা আবার ভাবুন। জামায়াতের জ্বলে এটাতে উল্লাসিত না হয়ে আরেকটু খোঁজখবর করেন। আওয়ামী লীগ এই ব্যাংক নিয়ে নেওয়ার পরও, তারা সারভাইব করতে পেরেছিল। আবারও পারবে। কারণ, তারা বিরোধীদলে। ইকোনমি কলাপসের পরিণতি তাদেরকে ভোগ করতে হবে না। করতে হবে সরকারকে, পুরো দেশকে। তাই ব্যাংকিং খাত নিয়ে যে কোনো চুদুরবুদুরের বিরুদ্ধে শক্ত করে বলুন। আর যদি বিএনপি সরকারকে ভালোবাসেন, তাহলে আরও বেশি করে বলুন।
লেখক রাজীব আহমেদ
সিনিয়র সাংবাদিক
লেখাটি লেখকের ফেসবুক টাইমলাইন থেকে নেওয়া
Author