
(১)
সীমান্তে অত্যন্ত উদ্বেগজনক সময় পার করছে বাংলাদেশ। প্রতিবেশী দেশের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা যে কোনো মুহূর্তে উপচে এসে পড়তে পারে বাংলাদেশে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ থেকে শুরু করে সম্প্রতি পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসা শুভেন্দু অধিকারী; সবাই বাংলাদেশের প্রতি নিরন্তর ঘৃণা ছড়িয়েছেন নানা বক্তৃতায়। এর মধ্যেই গত দু মাসে লালমনিরহাট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্তে একাধিক বাংলাদেশী হত্যার শিকার হয়েছেন ভারতীয় বাহিনী বিএসএফ-এর হাতে। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে সিলেট সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলির জবাবে পাল্টা গুলি ছুঁড়েছিল বিজিবি। লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে বিএসএফ জওয়ানরা বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে গরু চুরি করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে গ্রামবাসির প্রতিরোধের মুখে পড়ে। এইসব উত্তেজক ঘটনাবলীর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে পুশইনের প্রচেষ্টা। গত কয়েকদিনে বেনাপোল সীমান্তে শতাধিক নারী-পুরুষকে বাংলাদেশের ভেতরে ‘পুশইন’ করার জন্য সীমান্তে জড়ো করার খবর পাওয়া যায। ৩১ মে রাতে অন্তত ১৩ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে, যারা গত কয়েকদিন ধরে সীমান্তের শূণ্য রেখায় মানবেতর জীবনযাপন করছে।
এই রকম উদ্বেগজনক অবস্থার মধ্যেই গত ২ জুন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, "আপনারা যেটাকে বর্ডার কিলিং বলছেন, সে সম্পর্কে যদি বিস্তারিত জানেন তাহলে খুশি হব। যদি অন্য দেশের বাহিনী আমাদের সীমান্তে বা শূন্য রেখায় এসে কাউকে হত্যা করে, সেটাকে আমরা বর্ডার কিলিং বা সীমান্ত হত্যা বলতে পারি। কিন্তু আমাদের সীমানার ভেতরে কিংবা তাদের সীমানার ভেতরে কেউ কোনো অপরাধে জড়িত থাকলে বা অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করলে, সেটি তারা তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী মোকাবিলা করবে। এটাকে ‘বর্ডার কিলিং’ বলা ঠিক হবে না।"
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যটি আজ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
(২)
এক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের কয়েকটি শব্দ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শব্দগুলো হলো: “অপরাধে জড়িত”, “অবৈধ অনুপ্রবেশ”, “নিজস্ব আইন অনুযায়ী মোকাবিলা”, “বর্ডার কিলিং বলা ঠিক হবে না।” এই শব্দগুলো একটি নির্দিষ্ট বয়ান তৈরি করে। এতে নিহত ব্যক্তিকে আগে থেকেই “অপরাধী” বা “অনুপ্রবেশকারী” হিসেবে ফ্রেম করা হচ্ছে। কিন্তু কোনো নিরপেক্ষ তদন্তের আগে নিহত ব্যক্তি অপরাধী কি না, তা রাষ্ট্রীয়ভাবে ধরে নেওয়া ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাছাড়া “নিজস্ব আইন অনুযায়ী মোকাবিলা”র কথা বলে তিনি বিষয়টিকে মানবাধিকার প্রশ্ন থেকে সরিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার প্রসঙ্গে নামিয়ে এনেছেন।
(৩)
‘বর্ডার কিলিং’ আসলে কী?:
আন্তর্জাতিক আইনে ’সীমান্ত হত্যা’ নামে একক, স্থির, কোনো চুক্তিতে নির্ধারিত কোনো সংজ্ঞা নেই। এটি মূলত মানবাধিকার ও সীমান্ত-নিরাপত্তা আলোচনার একটি ব্যবহারিক পরিভাষা। আইনগতভাবে এটি সাধারণত যেনতেন ভাবে কারও জীবন হরণ (arbitrary deprivation of life), অতিরিক্ত শক্তিপ্রয়োগ (excessive use of force), বা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের (extrajudicial killing) আওতায় পড়ে।
মানবাধিকারের প্রশ্নটিকে সামনে রেখে বিবেচনা করলে, সীমান্ত হত্যা হলো এমন মৃত্যু, যেখানে কোনো ব্যক্তি আন্তর্জাতিক সীমান্ত, জিরো লাইন, সীমান্তঘেঁষা এলাকা বা সীমান্ত পারাপার কিংবা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাসম্পন্ন বাহিনীর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগে নিহত হন, এবং সেই বলপ্রয়োগ প্রয়োজনীয়, আনুপাতিক ও আইনসম্মত ছিল কি না তা প্রশ্নবিদ্ধ।
এই সংজ্ঞায় তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
১. ঘটনা সীমান্ত-প্রেক্ষিতের সঙ্গে যুক্ত কি না; (শূণ্য রেখার বাইরেও, যে কোনো দেশের ভূমিতেও হতে পারে)
২. হত্যাকারী পক্ষ রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বসম্পন্ন কেউ কি না;
৩. প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ জরুরি আত্মরক্ষা বা জীবনরক্ষার জন্য অপরিহার্য ছিল কি না।
ইন্টারন্যাশনাল কনভেনেন্ট অব সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর)-এর অনুচ্ছেদ ৬ অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষের জীবনধারণের অধিকার আছে এবং কাউকে ইচ্ছামতো বা যথেচ্ছাভাবে জীবন থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। জাতিসংঘের বেসিক প্রিন্সিপলস অন দ্য ইউজ অব ফোর্স অ্যান্ড ফেয়ারনেস অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেবল কঠোর প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে এবং দায়িত্ব পালনের প্রয়োজন অনুযায়ী বলপ্রয়োগ করতে পারে; প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের মানদণ্ড আরও কঠোর।
এ আলোচনার প্রেক্ষিতে কয়েকটি কেস বিশ্লেষণ করা যেতে পারে:
১) সীমান্তরক্ষী বাহিনী জিরো লাইনে বা সীমান্তঘেঁষা এলাকায় কাউকে গুলি করে হত্যা করলে তাকে সীমান্ত হত্যা বলা যাবে। এটাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথিত সীমীত সংজ্ঞায়ন।
২) কেউ অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয়েছে, কিন্তু নিরস্ত্র বা গ্রেপ্তারযোগ্য অবস্থায় ছিল, তবু তাকে জিরো লাইনের বাইরে দুই দেশের যে কোনো প্রান্তে হত্যা করা হয়েছে। এমন অবস্থাকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সীমান্ত হত্যা বলতে চাননা। অথচ এমন ক্ষেত্রেও ঘটনাটি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত এবং সেখানে সন্দেহভাজন ব্যক্তিটি গ্রেপ্তারযোগ্য অবস্থায় ছিল, কিন্তু তাকে হত্যা করা হয়েছে। এবং হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী।
অতএব, “ভারতের ভেতরে ঘটেছে” বলেই সেটি সীমান্ত হত্যা নয়, এই যুক্তি দুর্বল। প্রশ্ন হওয়া উচিত: মৃত্যু কি সীমান্ত পারাপার, সীমান্ত টহল, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অ্যাকশন, বা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিল? যদি যুক্ত থাকে, তাহলে সেটি সীমান্ত হত্যা হিসেবে আলোচ্য হতে পারে।
(৪)
মন্ত্রীর এই বক্তব্যের সমস্যা কী?
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য মূলত সীমান্ত হত্যার প্রসঙ্গটিকে হালকা করছে। তিনি সীমান্ত হত্যাকে শুধু তখনই স্বীকার করছেন, যখন “অন্য দেশের বাহিনী আমাদের সীমান্তে বা জিরো লাইনে এসে” কাউকে হত্যা করবে। কিন্তু বাস্তবে সীমান্ত হত্যার বড় অংশ ঘটে সীমান্ত পারাপার, কাঁটাতার, জিরো লাইনের আশপাশ, নদী-সীমান্ত, চোরাচালান সন্দেহ, বা অনুপ্রবেশের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর ‘ট্রিগার হ্যাপি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সীমান্তে বিএসএফ-এর দেদারসে হত্যা, নির্যাতন, যাকে-তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া এবং যথাযথ তদন্তের অভাবের কথা বলা হয়েছে। সুতরাং, “অনুপ্রবেশকারী” বা “অপরাধে জড়িত” শব্দ ব্যবহার করে পুরো ঘটনাকে সীমান্ত হত্যার আলোচনার বাইরে সরিয়ে দিলে মূলত ভারতীয় অপরাধীদের দায়মুক্তির সুযোগ সৃষ্টি হয়। কারণ এর মধ্য দিয়ে মূল প্রশ্নটি আড়ালে চলে যায়। সেটি হলো হত্যা না করে গ্রেপ্তার করা যেত কি না, প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ অপরিহার্য ছিল কি না, এবং বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না।

অধিকন্তু, বক্তব্যটি কার্যত ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী - বিএসএফ এবং ভারতীয় রাষ্ট্রীয় অবস্থানকে সুবিধা দেয়, অন্তত দুই দিক থেকে। প্রথমত, এটি নিহত ব্যক্তির ‘ভিকটিম’ পরিচয়কে লুকিয়ে অপরাধী’ পরিচয় তৈরি করে। এতে তদন্তের আগে নৈতিক দায় নিহত ব্যক্তির ওপর চাপানো যায়।
দ্বিতীয়ত, এটি বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সীমান্ত হ’’ত্যা শব্দের কূটনৈতিক চাপ কমিয়ে দেয়। কারণ বাংলাদেশ নিজেই যদি বলে, অনুপ্রবেশ বা অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যু সীমান্ত হ’’ত্যা নয়, তাহলে ভারত আলোচনায় একটি বাড়তি সুযোগ পেতে পারে।
তাছাড়া, প্রায়ই খবর পাওয়া যায় যে, সীমান্ত থেকে বাংলাদেশীকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করে হ’’ত্যা করা হয়েছে। এমন ঘটনাগুলো তখন সীমান্ত হ’’ত্যার সংজ্ঞার বাইরে চলে গেলে বিপুল মানুষ ন্যয়বিচারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলের শাহানাবাদ গ্রামের নিহত আজিজুর রহমানের ঘটনাটি সামনে আনা যেতে পারে। ২০২৫ সালের ১৩ মে কৃষক আজিজুর রহমান তার গোয়ালের গরুর জন্য ঘাস কাটতে গিয়েছিলেন। সে সময় বিএসএফ সদস্যরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর নির্যাতন করা হয়। তিনি ভারতের জেল, হাসপাতাল পেরিয়ে, যাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায় বলা যায় অভ্যন্তরীণ আইনের বেড়াজাল পেরিয়ে চলতি বছরের ২২ মার্চ মারা যান। তার লাশ দেশে আসে এপ্রিলের শুরুতে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংজ্ঞায় এই আজিজুর রহমানের হ’’ত্যাকাণ্ড বর্ডার কি’’লিং নয়! অথচ ঘটনায় অভিযুক্ত ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সদস্যরা।
ফলে বাংলাদেশের খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে ‘অপরিনামদর্শী’ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, সীমান্তে অপরাধ, চোরাচালান, অনুপ্রবেশ, পুশ-ইন, মানবপাচার, মাদক পাচার নিশ্চয়ই বাস্তব নিরাপত্তা সমস্যা। রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষার অধিকার আছে। কিন্তু রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষার অধিকার মানুষের জীবনধারণের অধিকারকে বাতিল করতে পারে না।
ফলে অবৈধ অনুপ্রবেশ বা সীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় স্পষ্ট আইন ও দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে। কিন্তু বিচারবহির্ভূত প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সীমান্ত-প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে মৃত্যু ঘটলে সেটি অবশ্যই সীমান্ত হত্যা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা ও দায় নির্ধারণ করতে হবে।
Author