
বোঝা খুব জরুরি যে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, রাজস্ব, প্রবাসী শ্রমিকের স্বার্থ, শিক্ষা, চিকিৎসা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের যেসব সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং হতে থাকবে, তার ৯৯ শতাংশ দায় আমলাদের, রাজনৈতিক সরকারের নয়। আর সকল স্তরে এই আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করছে অ্যাডমিন ক্যাডারের প্রায় ৬ হাজার আমলা, যারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান (স্টেট-ওনড এন্টারপ্রাইজ) এবং সংস্থার শীর্ষ পদে বসে আছে।
রাজনৈতিক সরকারকে আমরা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করি এবং ধরে নিই যে তারাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে সকল ব্যর্থতার দায় আমরা তাদের দিই—সেটা ঠিক আছে, এই দায় তাদের নিতেই হবে। কিন্তু এটাও বোঝা জরুরি, একটি মন্ত্রণালয় বা একটি অঙ্গসংস্থার ৯৯ শতাংশ সিদ্ধান্ত আমলারাই নেন, মন্ত্রী বা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ নেন না। একটি মন্ত্রণালয়ের ৯০ শতাংশ নথি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরিত হয় না। এসব সিদ্ধান্ত নেন অ্যাডমিন ক্যাডারের আমলারা।
রাজনীতিবিদরা এটা স্বীকার করতে চান না। কারণ তারা জনগণের সামনে একটি নিয়ন্ত্রণের ভাবমূর্তি দেখাতে চান, বোঝাতে চান যে ক্ষমতা তাদের হাতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অ্যাডমিন ক্যাডারের আমলাদের পরিচালিত মন্ত্রণালয় ও অঙ্গসংস্থাগুলোতে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ যে এক শতাংশ সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাও অ্যাডমিন আমলাদের বেঁধে দেওয়া সীমানার ভেতরে।
ফলে আজকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র যে জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং ক্রাইসিস, কর্মসংস্থানের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—এর সবকিছুর পেছনে অবশ্যই শেখ হাসিনার ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থা দায়ী। কিন্তু সেই শাসনকাঠামোটি ছিল একটি আমলাতান্ত্রিক শাসনকাঠামো, যা নিয়ন্ত্রণ করেছে মন্ত্রণালয়গুলোর শীর্ষে থাকা অ্যাডমিন ক্যাডারের আমলা ও সচিবেরা।
আমি স্পষ্ট দেখতে পারি, এই সচিব ও অ্যাডমিন ক্যাডারের আমলাদের কাছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বন্দি। তারা এমন সব নিয়ম, কাঠামো ও প্রক্রিয়া তৈরি করে রেখেছেন, যার ভেতর দিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। যার পরিণতিতে তারা ব্যর্থ হবে, বাংলাদেশের মানুষ ভুগবে। এবং বিরোধী দল—তারাও যদি আগামীতে ক্ষমতায় আসে, একই সংকটের মধ্যে থাকবে।
ফলে আসলে আমাদের যে লড়াই, সেটা এই অ্যাডমিন ক্যাডারের আমলা ও সচিবদের বিরুদ্ধে লড়াই। আমাদের লড়াই হচ্ছে তাদের ক্ষমতা হ্রাস করে অন্যান্য ক্যাডারের হাতে ক্ষমতা বণ্টন করা; সমাজের ভেতরে থাকা যোগ্য মানুষদের সকল মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার সামনে নিয়ে আসা। এটা তারা হতে দেবে না।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে এক বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি অনেক সহানুভূতি রাখি। আমি যখন অধ্যাপক আসিফ নজরুলকে দেখতাম, তাকে আমার মনে হতো একলা একজন মানুষ, যিনি ৫০ জন লোকের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন—যে লড়াইয়ের গল্প তিনি করতে পারছেন না, কারণ এগুলো গোপনীয় বিষয়।
ফলে আজকে আমাদের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে সমর্থন দিয়ে যেতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে, আজকে যে নীতির সার্বিক ব্যর্থতা, তার কতটুকু দায় রাজনৈতিক ক্ষমতার, আর কতটুকু দায় প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও অঙ্গসংস্থার শীর্ষে বসে থাকা অ্যাডমিন ক্যাডারের আমলাদের। প্রকৃত শত্রুকে যদি চিনতে না পারেন, যুদ্ধে কখনো বিজয়ী হতে পারবেন না।
(লেখকের ফেইসবুক পোষ্ট থেকে নেয়া।)

Author